top of page

একজন পূর্ণ মানুষ, কিছু টুকরো কথায়/২

  • Writer: প্রতিরোধের ভাষা
    প্রতিরোধের ভাষা
  • Sep 20, 2021
  • 9 min read

Updated: Sep 21, 2021

যাঁরা ব্যক্তিগতভাবে সরোজ দত্তকে চিনতেন না


কৃষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

কবি, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, অনুবাদক - সরোজ দত্তের অনেক পরিচিতি। কিন্তু সব পরিচয়কে ছাপিয়ে যে পরিচয় সামনে আসে তা হল তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত কমিউনিস্ট বিপ্লবী। চারু মজুমদার মাও সে তুঙ-এর উক্তি স্মরণ করে সরোজ দত্ত সম্পর্কে বলেছিলেন,"কমরেড সরোজ দত্ত তাঁর সারা কর্মব্যস্ত জীবনে কখনওই বিপ্লবী চিন্তা ও কর্ম থেকে বিচ্যুত হননি।মৃত্যুও তাঁর কাছে হার মেনেছে। তিনি ছিলেন প্রকৃত বীর,প্রকৃত বিপ্লবী"।

চারু মজুমদার সরোজ দত্ত এবং নকশালবাড়ি আন্দোলনের অনেক নেতাকে প্রথম দেখেছিলাম ব্রিগেড-এর সভায়।তাঁরা মঞ্চে অনেকের সঙ্গে আমি মাঠে দর্শক শ্রোতা হয়ে।প্রচুর উত্তেজনা নিয়ে ঘরে ফেরা। সেদিন থেকেই নিজেকে নকশালবাড়ি আন্দোলনের একজন কর্মী হিসেবে ভাবতে শুরু করা। ১৯৭০ সাল গান্ধী আর লেনিনের জন্ম শতবর্ষ। বোন জানাল স্কুলে একই দিনে লেনিন আর গান্ধীর জন্ম শতবর্ষ পালন করা হবে।মন বিদ্রোহ করে উঠল এটা কিছুতেই করতে দেয়া যায় না।তারপর বললাম ঠিক আছে বাধা দেব না কিন্তু কিছু করতে হবে। "দেশব্রতী"র শশাঙ্ক-র শরণাপন্ন। বিপ্লবী কাজ করতে গেলে শশাঙ্ক ছাড়া হয় নাকি।আমাদের আকর্ষণ পত্রিকার শেষ পাতা যেখানে শশাঙ্ক লেখেন। পেয়ে গেলাম আজ প্রতিক্রিয়াশীল দেশগুলি কীভাবে দেখে লেনিনকে তা দারুণভাবে দেখিয়েছেন। বোনকে বললাম একটা লেখা লিখে দিচ্ছি সেটা পাঠ করবি। শশাঙ্ক লিখেছেন,"একদিন যাকে এরা শত্রু হিসেবে নানারকম কুৎসা করে তাঁরই মৃত্যুর পর তাঁর পেছনে দিকচক্রবাল স্থাপন করে তাঁকে দেবতা বানায়"। তার সঙ্গে আরও কিছু লিখে দুই মেরুর দুজন গান্ধী আর লেনিনের একই সঙ্গে জন্ম শতবর্ষ পালন করা যায় না। এইভাবেই তিনি তাঁর লেখার মধ্যে দিয়ে আমাদের বিপ্লবী হওয়ার শিক্ষা দিতেন। শশাঙ্কের ওই কলামে আরও কত অসাধারণ লেখা পেয়েছি। দেশব্রতীর প্রথম পাতায় মনে আছে আর একটা ছোট্ট কবিতা, কবিতাটির অনুবাদক হিসেবে সরোজ দত্তের নাম ছিল; ভিয়েৎনাম যুদ্ধের সময় বারবারা নামে আমেরিকার একটি এগারো বছরের ছোট মেয়ের লেখা (সবটা মনে নেই আমার)

"কার নামে পাঠাচ্ছ

নাপাম বোমা আর বিষাক্ত গ্যাস?

যারা ভালবাসা ছাড়া জানে না কিছুই "।

অনেক দেশের লড়াই জয়ের কথা আমাদের শুনিয়েছে সরোজদা দেশব্রতী পত্রিকার মাধ্যমে।

সারা দেশে বিপ্লবীদের কাছে ছুটে গেছেন।আমরাও এইভাবেই তাঁকে পেয়েছি।

সরোজদাকে আগের লেখা থেকে পরের লেখাগুলির শৈলী কমে গেছে এবং কবিতা লিখছেন না বলে দুঃখ প্রকাশ করেছেন কিন্তু তিনি বিপ্লবকেই আগে বেছে নিয়েছেন এবং তাঁর কবিতা বিপ্লবের জন্যই বিপ্লবকে বাদ দিয়ে নয়।

তার লেখার মধ্যে অনেকে বেশিমাত্রায় ক্রোধের প্রকাশ দেখতে পেয়েছেন। সরোজদা বলতেন বিপ্লবী ক্রোধ শত্রুর প্রতি ক্রোধ নরম হয় না কঠিন কঠোর হয়।

সরোজ দত্তকে পার্টির অনেক দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। পার্টি কংগ্রেসে যে কর্মসূচিগুলি গৃহীত হয়েছিল সেগুলি সেগুলি কংগ্রেসে উপস্থিত সমস্ত কমরেডের সম্মতিক্রমে।কংগ্রেসে একজনও কোনও বিষয়ের ওপর দ্বিমত পোষণ করেননি। এরপর অনেক কমরেড সমালোচনা শুরু করলেন এবং সমস্ত দায় চাপালেন চারু মজুমদারের ওপর। সরোজ দত্ত চারু মজুমদারকে কখনওই ছাড়েননি।পার্টি কংগ্রেসের গৃহীত সিদ্ধান্তগুলি কার্যকর করার জন্য আরও তৎপর হলেন।শত্রুরা এই সময়ের অপেক্ষা করছিল। শত্রুরা জানে সরোজ দত্তকে শেষ করতে পারলে চারু মজুমদারকে শেষ করা সহজ হবে।কারণ নেতৃত্বের অনেকেই সরে গেছেন চারু মজুমদারের পাশ থেকে। একমাত্র সরোজ দত্তই তাঁর পাশে তাঁকে আগলে রেখেছেন। সরোজদাক একটু বেশি ঝুঁকি নিয়ে নানা জায়গায় যাওয়া আসা করছিলেন।বলতেন বিপ্লব করতে গেলে ঝুঁকি নিতেই হবে। তিনিও বিশ্বাস করতেন ভারতবর্ষের মুক্তির দিন খুব বেশি দূরে নয় তাই বসে থাকলে হবে না একটু দ্রুতগতিতেই কাজ করতে হবে। কমরেডরা সরে যাওয়ায় তাঁকে অনেকটাই দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। ১৯৭১-এর ৪ অগস্ট তাঁকে কলকাতার এক শেল্টার থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং বিচারের প্রহসন মাত্র দেখায়নি পুলিশ সেই রাতেই অর্থাৎ ৪/৫ অগস্ট তাঁকে খুন করে পুলিশ। আর যাঁরা সরে যাননি, নেতৃত্বে ছিলেন, তাঁদেরও দায় ছিল সরোজদাকে রক্ষা করা। সরোজদাকে যেভাবে চারু মজুমদারকে রক্ষা করছিলেন পরবর্তী নেতৃত্বের ভুলেই হোক বা যে কোনও কারণেই হোক সরোজদার হত্যার এক বছরের মধ্যেই সিপিআই (এমএল)এর সর্বোচ্চ নেতৃত্ব চারু মজুমদারকে ভারতের বিপ্লবীরা হারান।

সরোজ দত্তের জীবনসঙ্গী বিপ্লবী বেলা দত্তের স্মরণকথা দিয়েই শেষ করি বরং –

"দুজনকেই পুলিশ আটক করে ও হত্যা করে, লড়াইয়ের মধ্যে থেকেই ওঁরা প্রাণ দিয়েছেন। শ্রেষ্ঠ মৃত্যু, ওঁরা শহিদ। দুজনেই আমারকাছেপরম শ্রদ্ধেয়। সরোজ দত্তের মৃত্যুতে আমি মনের জোর হারাইনি, বেদনার সঙ্গে গর্ব অনুভব করেছিলাম, আজও করি।কিন্তু চারু মজুমদারের মৃত্যু আমাকে ধাক্কা দিয়েছিল অনেক বেশি, হতাশা গ্রাস করেছিল, এরপর কী? সামনের আলোটা নিভে গিয়েছিল দপ করে।"


[১৯৬৯-তে সিপিআই (এম এল)প্রতিষ্ঠার সময় থেকে কৃষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন; অর্ধশতক পেরিয়েও নিঃসংশয়ে বলেন “আমি গর্বিত যে আমি সেই পার্টির সদস্য ছিলাম যে পার্টিতে ছিলেন কমরেড চারু মজুমদার, কমরেড সরােজ দত্ত, কমরেড জহর। কৃষকদের মধ্যে পার্টির কাজ করেছেন হুগলি জেলায়, মূলত গান্নেগড় গ্রামে। ১৯৭৪-এ গ্রেফতার হন, ‘৭৭ অবধি ছিল তাঁর কারাজীবন। আজও নিপীড়িত মানুষের মুক্তির সংগ্রামের পক্ষে এক সােচ্চার ও অগ্রণী মুখ তিনি।]


পিয়াসা ভট্টাচার্য দাশগুপ্ত

এটা একটা এমন সময় ছিল যখন মানুষ আর আগের মতন থাকতে চাইছিল না। চতুর্দিকে ধর্মঘট,সরকারও আর পারছে না আগের মতো থাকতে। ১৯৬৭ র ২৫ শে মে জ্বলে উঠল নকশালবাড়িতে কৃষক বিদ্রোহের আগুন। রেডিও তে সারাদিন নকশালবাড়ি-নকশালবাড়ি।আমি কলেজ-পড়ুয়া ভাবছি, চাষারা আবার কী করছে ওখানে! সরকার আবার গুলি চালিয়ে মেরেও দিল ১১ জনকে!৭ জন নারী,১ জন শিশু!ব্যাপারটা কী? একি ব্রিটিশ সরকার নাকি? তোলপাড় - তোলপাড়! পড়াশুনা মাথায় উঠলো।

সিপিআই রাজনীতি থেকে সিপিএম-এ যেতে যেতে বন্ধু অসিতা সিনহার সব প্রশ্নের উত্তরে দমকা হাওয়ায় নতুন করে চিনলাম, জানলাম। আধাঔপনিবেশিক আধাসামন্ততান্ত্রিক দেশ. মিথ্যা স্বাধীনতা, কৃষি বিপ্লব, দেশের মুক্তি।রুশ সামাজিক সংশোধনবাদ , চীন বিপ্লব।হুনান রিপোর্ট, তরাই রিপোর্ট।যেতে হবে কৃষকের কাছে? যেতে হবে। ওরাই তো দেশ. ওরাই তো দেশের আসল সম্পদ। আমরা ক'জন যুবছাত্র - অচিন্ত্য, কালিপদ, নাজিম, প্রহ্লাদ, অসিত, ঝন্টু… এল আই সি-র শঙ্করদা - আমরা পথে নামলাম।

নকশালবাড়ির রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে ব্যাপক প্রচারে নেমে পড়লাম।কম. অচিন্ত্য ভট্টাচার্য, কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাইপো, এনে দিত দেশব্রতী। শশাঙ্কের লেখা পড়তে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়তাম তখন।ভীষণভাবে উদ্বুদ্ধ হতাম আমরা। এমন বলিষ্ঠ ভাষায়, এমনভাবে সংশোধনবাদের সমালোচনা, কৃষিবিপ্লবের কথা, শ্রেনিশত্রু খতমের রাজনীতি আগে কখনো শুনিনি। মনীষীদের ভুলভ্রান্তির কথা বললেন। বললেন, সিপাহী বিদ্রোহের নায়কদের মূর্তি আর যারা তার বিরোধিতা করেছিল তাদের মূর্তি একসাথে থাকতে পারে না। শুরু হল. মূর্তি ভাঙার রাজনীতি। বুর্জোয়া শিক্ষা আরো মূর্খ বানাবে আমাদের। গ্রামে যেতে বললেন চারু মজুমদার, ছটফট করতে লাগলাম আমরা। আশেপাশের গ্রামে নিজ উদ্যোগেই চলে গেলাম। পরবর্তীকালে শুনেছিলাম, কমরেড সরোজ দত্ত, আমাদের কমরেড শশাঙ্ক নিজ উদ্যোগে কাজে বাধা দিতেন না কাউকে, উৎসাহ দিতেন।

যশোর জেলার নড়াইল গ্রামের বিখ্যাত দত্ত পরিবারের ছেলে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংলিশে এম এ, যুগান্তর, অমৃতবাজার, স্বাধীনতা প্রভৃতি বিভিন্ন পত্রিকার সহ-সম্পাদক বা সম্পাদক, বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায় অজস্র উচ্চস্তরের কবিতার লেখক, মায়াকোভস্কি-ক্রুপস্কায়া, মাও ৎসে তুঙের লেখা কবিতা বা তলস্তয়ের লেখার অনুবাদ করা আমাদের প্রচন্ড ভালোবাসার কমরেড সরোজ দত্তকে ‘৭১ সালের ৪ঠা আগস্ট দক্ষিণ কলকাতায় পুলিশ গ্রেফতার করে। এবং রুনু গুহ-দেবী রায়রা পরের দিন অর্থাৎ ৫ই আগস্ট ভোরের অন্ধকারে ময়দানে নিয়ে গিয়ে গুলি করে মারে। তারপরে মাথা কেটে সরিয়ে ফেলে। পুলিশের খাতায় কিন্তু তিনি আজ নিখোঁজ। গলা কাটার সময় পুলিশ নাকি বলেছিল,'শ্লা,সরোজ দত্তকে মেরে আজ কলকাতায় বুদ্ধিজীবী খতম আরম্ভ করলাম। যার যার গায়ে বামপন্থী গন্ধ পাবো, এইভাবেই খতম করব।' শুনেছিলেন ময়দানে প্রাতঃভ্রমণে যাওয়া নায়ক; স্টুডিওতে এসে সহ-অভিনেতা বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'সরোজ দত্ত কে রে?' তারপরের নভেম্বরের 'বাংলাদেশ' পত্রিকায় বের হল মহানায়কের বাংলা ছাড়ার নেপথ্য কাহিনী।

স্তব্ধ হয়ে গেলেন মানুষ। এত বড় পাশবিকতা ! এতো বড় নারকীয়তা !কাজল ব্যানার্জীকে হারিয়েছিলাম ঠিক এক বছর আগে. তখন আমি সেন্ট্রাল কলকাতায় কমরেডদের সাথে কাজ করছিলাম। কয়েকজন কমরেড শপথ নিয়েছিল - মনে আছে কানু- চন্দন ওরা শপথ নিয়েছিল, দেবী রায়-রুনু গুহর মুন্ডু চাই-ই চাই। কাজলকে যারা মেরেছিলো, অসংখ্য কমরেডকে মেরেছিলো যারা, তারাই কমরেড সরোজ দত্তকে মেরেছে। তার পরেও তারা বেঁচে ছিল।সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ও বেঁচে ছিল কলকাতায় ... এটাই আশ্চর্য।

সরোজ দত্তের 'রত্নাকর' অসংখ্য উচ্চাঙ্গের কবিতার একটি। না উদ্ধৃত করে পারছি না। বুদ্ধদেব বসু এবং সমর সেনদের সাথে কবিতা নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক হত তাঁর। সমর সেন পরে স্বীকার করেছিলেন, সরোজ দত্ত ঠিকই বলতেন।

নির্মল নদীর জলে রক্তমাখা স্খলিত পালক

আকাশ চিরিয়া যায়, বিচ্ছেদের বুকভাঙা ডাকে;

সম্মুখে দাঁড়ায়ে হাসে নির্বিকার নিলাজ নিষাদ

অহিংসার নেশা হাতে রাঙা চোখে রত্নাকর জাগে |

করুণ জিজ্ঞাসা নিয়ে জেগে রয় বিস্মিত ব্যথায়

চরণে মরণাহত মরালের মরা দুটি চোখ---

লজ্জায় নির্বাক ঋষি, বেদ মন্ত্রে মেলে না জবাব

বিজয়ী ব্যাধের চোখে প্রতিষ্ঠার স্বর্ণ স্বপ্নালোক |

বিস্মৃতির ভস্ম হতে জেগে ওঠে আগ্নেয় অতীত,

ঋষির শিরায় জ্বলে তীব্র দাহ তিক্ত বঞ্চনার |

আজও কি জাগিয়া আছে নিরানন্দ নিরন্ন কুটিরে

শিশুর কঙ্কাল কোলে চর্মস্তনী প্রেয়সী তাহার ?

হেসে ওঠে দস্যু কবি অক্রোধের ক্লীবলজ্জা ছেড়ে

তামসীর তৃপ্তির দিন সাঙ্গ হল তমসার তীরে।

একবার বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার সময়ে তাঁর স্ত্রী বেলা দত্ত নাকি বলেছিলেন, 'সাবধানে থেকো!' উত্তরে তিনি বলেছিলেন, 'এইটা তুমি কী বললে ? যুদ্ধে বাহিনী যেমন মরবে, দু-একটা সেনাপতিও কি মরবে না?’


[১৯৬৭-তে নকশালবাড়ি ঘটার প্রায় সাথে সাথেই মেদিনীপুরে যােগ দিয়েছিলেন বিপ্লবী আন্দোলনে। '৭০-এ মধ্য কলকাতা চলে এসে তালতলা এলাকার সিপিআই (এম এল)-এ সক্রিয় ছিলেন। '৭১-এ দুর্গাপুরে চলে যান, ওখান থেকেই গ্রেফতার হন। '৭৩-এ জেল থেকে বের হন, বিপ্লবী সংগ্রামের প্রতি অবিচল আস্থা নিয়েই।]

মনজুরুল হক

কবি-সাংবাদিক সরোজ দত্তের সব চেয়ে বড় পরিচয় হলো তিনি হলেন এক আজন্ম বিপ্লবী কমিউনিস্ট যাঁর কর্মকাণ্ড নিশানা করেছিল পুরনো সমাজকে ভাঙার কাজে এবং পুরনো সমাজের সামন্ততান্ত্রিক-ঔপনিবেশিক ধ্যান ধারণা, চেতনা এবং সেই সমাজের কর্তাদের দ্বারা তাদের শ্রেণির শোষণের স্বার্থে যে সমস্ত প্রথা সৃষ্টি করেছিল, এবং শাসক শ্রেণির যে সব স্বার্থবাহীদের মহান বলে স্থাপন করা হলো, তাদের সেই সব স্থাপনাকে ধ্বংস করার কারিগরদের প্রধান ছিলেন সরোজ দত্ত। তিনি বিপ্লবী এবং তার বিপ্লবী সংগ্রাম ও বিপ্লবী রাজনীতি থেকে তাঁকে বিচ্ছিন্ন করে দেখানোর প্রচেষ্টা আসলে সামন্তবাদ সাম্রাজ্যবাদের পা চাটা কুকুর বুদ্ধিজীবীদের একটি শয়তানি ষড়যন্ত্র । যেমন লেনিন বলেছিলেন যে কোনও মহান বিপ্লবীর মৃত্যুর পর বুর্জোয়াদের পেটোয়া বুদ্ধিজীবীরা তাদের নিরীহ বুদ্ধিজীবী হিসেবে চালাবার চেষ্টা করে তাঁদের রাজনীতির থেকে তাঁদের বিচ্ছিন্ন করে। অথচ এই বুদ্ধিজীবীরাই বিপ্লবীদের জীবনকালে তাদের বাপান্ত না করে পানি গ্রহণ করে না।

সরোজ দত্ত ছিলেন এদের বিরুদ্ধে। তার কলমের ধারে মুণ্ডপাত হতো এহেন বুদ্ধিজীবী শ্রেণির ও তাদের মালিকদের। মাও সে তুঙের চিন্তাধারার আলোয় যখন চারু মজুমদার ভারতবর্ষে গড়ে তুললেন নকশালবাড়ি তখন সরােজ দত্ত সমস্ত সংশােধনবাদের বিরুদ্ধে লড়াই জারি রেখে দেখালেন চারু মজুমদারের পথের সার্থকতা এবং সিপিআই (এম-এল) পাটি প্রতিষ্ঠা করায় এক মহান ভূমিকা পালন করেন। পার্টির ভিতরে ও দেব্রতী পত্রিকার মাধ্যমে চারু মজুমদারের বিপ্লবী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সবচেয়ে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেন সরোজ দত্ত। তাই তো তিনি ঘৃণিত হলেন সাম্রাজ্যবাদের পা-চাটা সংশোধনবাদী কুকুরদের কাছে এবং তাদের পেটোয়া সাংবাদিককুলের কাছে।

চারু মজুমদার বললেন “সরোজ দত্তের ক্ষুরধার লেখনীকে ভয় করত না এমন কোনও প্রতিক্রিয়াশীল নেই”। আর তাই তাঁকে খুনি ইন্দিরার খুনি পুলিশ শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হলো না, ৭০ বছরের বিপ্লবীকে তার মাথা কেটে নিয়ে গেল ব্রেজনেভ-নিক্সন- ইন্দিরা-চবনের ভাড়াটে নেড়ি কুকুরের দল - ওদের খাতায় সরােজ দত্তকে নিখোঁজ দেখাতে। কিন্তু সরোজ দত্ত তো নিখোঁজ হলেন না। তিনি শহিদ হয়ে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে গেঁথে বসলেন বিপ্লবী শ্রমিক কৃষকের হৃদয়ে।


[মনজুরুল হক বাংলাদেশের বিপ্লবী রাজনীতির ভাষ্যকার, সম্পাদনা করেছেন ‘সরােজ দত্ত : নকশাল দ্রোহের মৃত্যুহীন প্রাণ’ বইটি]

বাচ্চু ব্যানার্জি

১৪ বছর বয়সে বাঁকুড়ার গ্রাম থেকে দুর্গাপুরে আসি, ১৭/১৮ বছর বয়সে দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্টে ঢুকতে হয় ঠিকা শ্রমিক হিসাবে, ১৯ বছরে সিপিআই (এম এল)-এ যুক্ত হয়ে পড়ি। পড়তে জানতাম না, তখনও সরোজ দত্তের লেখা নিয়ে বিশেষ কিছু ধারণা ছিল না, জানতাম তিনি পার্টির নেতা। ১৯৭১ সালের ৫ আগস্ট যখন সরোজদা' শহীদ হন, মনে আছে, প্রতিবাদে কমরেড দীনবন্ধু দে-র নেতৃত্বে জি টি রোডে বাস জ্বালিয়ে দিয়েছিলাম আমরা। এর কয়েক মাসের মধ্যেই আমি ধরা পড়ি, ওই '৭১ সালেই। জেলে গিয়ে আমার 'দেশব্রতী'-র শশাঙ্কর সাথে পরিচয় হলো, যখন তিনি আর আমাদের মধ্যে নেই। পড়তে না পারার জন্য জেলের কমরেডরা পড়ে শোনাতেন শশাঙ্কর লেখা। শুনেই মনে হয়েছিল, এ' তো আমারই অন্তরের কথা! এত সহজ ভাষায় এত কঠিন বিষয়কে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, ভাবতেও পারিনি। তখন বুঝেছিলাম কেন 'দেশব্রতী' বেরোলেই কমরেডরা কাড়াকাড়ি করতেন শশাঙ্কর লেখা আগে পড়বেন বলে। তাঁর ভাষা আমাকে টানত, আর তাঁর ছুরির মতো শান দেওয়া যুক্তি। কমরেড চারু মজুমদারের লেখা থেকেও নিঃসন্দেহে অনেক শিখেছি, কিন্তু সরোজদা'র লেখার আকর্ষণ আমার কাছে বরাবর বেশি ছিল। তাঁর লেখা পড়ে প্রথম অনুভূতি যেটা হতো তা হচ্ছে - ঘৃণা। শত্রুর প্রতি ঘৃণা। অনেক ভদ্রলোক বলেন, সরোজ দত্ত তাঁর লেখায় অহেতুক গালাগালি দিতেন - যেমন "শুয়োরের বাচ্চা", বা “লাথি মেরে শালাদের দাঁতের পাটি ভেঙে দিই...”। আমার মনে হয়েছে, ঠিকই তো করতেন। জনগণের শত্রুরা কি সত্যিই শুয়োরের বাচ্চা নয়? জনগণকে হাতে কিংবা ভাতে মেরে যারা মঞ্চে দাঁড়িয়ে জনগণের জন্য চোখের জল ফেলার নাটক করে, তাদের দাঁতের পাটি লাথি মেরে ভেঙেদিতে সত্যিই কি ইচ্ছে করে না আমাদের? আমরা কমিউনিস্ট, সত্যিটাকে সত্যি বলতে আমাদের বাধবে কেন? আমার অন্তরের শ্রেণীঘৃণাকে খুঁজে পেয়েছিলাম সরোজ দত্তের সে লেখাগুলিতে। এখন আমি পড়তে পারি (জেলে যে ছ'বছর ছিলাম, তখনই আমি কমরেডদের কাছে পড়তে শিখি), অনেক লিফলেট, লেখা হাতে আসে, কিন্তু কোথায় যেন শশাঙ্কর লেখার সেই ধার আর খুঁজে পাই না।


[বাচ্চু ব্যানার্জির শ্রমিক জীবনের শুরু দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্টে, শেষ দুর্গাপুর সিমেন্টে। সিপিআই (এম এল)-এর সক্রিয় কর্মী হিসাবে ১৯৭১ সালে জেলে যান, ১৯৭৭ অবধি তাঁর কারাজীবন]

সুশীল ঠাকুর

কমরেড সরোজ দত্তের লেখা আমাকে প্রভাবিত করেছিল কারণ শ্ৰেণীদৃষ্টিভঙ্গী, শ্রেনীবিশ্লেষণই হচ্ছে আসল কথা। এই শ্ৰেণীবিভক্ত সমাজব্যবস্থায় শোষণ থাকবে না, অত্যাচার থাকবে না, অসাম্য থাকবে না - তা তো হতে পারে না। সরোজ দত্তই আমাকে প্রথম ধরিয়ে দিয়েছিলেন যে, ব্রিটিশ ভারতে ব্রিটিশকে তাড়িয়ে ক্ষমতায় আসবে কারা? সামন্তপ্রভুরা। ১৯৬৭-তে যখন নকশালবাড়ি ঘটে গেল, তখন আমি ছোট, অতো কিছু বুঝিনি তখন, শুধু 'নকশাল' কথাটা তখন চারদিকে শুনতাম। এক পরিচিতজনকে কাকা বলে ডাকতাম, তাকেই একদিন জিজ্ঞেস করলাম "এই নকশাল কারা"? কাকা আমাকে বলল, "এই নকশালরাই হচ্ছে আসল কমিউনিস্ট"। সেদিন থেকেই বোধহয় আমি মনে মনে নকশালদের দিকে চলে এসেছিলাম। বাবা ছিলেন হুকুমচাঁদ জুট মিলের শ্রমিক, মা বিড়ি শ্রমিক। মা-র কাজের জায়গাতেও দেখতাম নারী শ্রমিকদের বেতন পুরুষদের থেকে কম। এইসব অসাম্য, দারিদ্র আমাকে কমিউনিজমের দিকে আকৃষ্ট করেছিল। ১৭ বছর বয়সে আমাকে পেটের তাগিদে সেই হুকুমচাঁদ জুট মিলেই ঢুকতে হয়। সেই সময়ে আমি ছিলাম নেতাজি সুভাষ বোসের চরম ভক্ত। প্রতি ২৩শে জানুয়ারি নিয়ম করে নিজের বাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলতাম, নেতাজির ছবিতে মালা দিতাম। কিন্তু যেদিন শশাঙ্কের কলমে 'সুভাষ বোস প্রসঙ্গে' পড়লাম আমার চোখ খুলে গেল সেদিন, সত্যি আর মিথ্যের ফারাকটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন কমরেড সরোজ দত্ত। মনীষী মূল্যায়ন নিয়ে তাঁর লেখাগুলি আজও আমাকে সমান ভাবে টানে। আমি বিপ্লবী রাজনীতিতে যুক্ত হই কমরেড সরোজ দত্ত শহীদ হয়ে যাওয়ার পরে। সেসময়ে দেশব্রতী নিয়মিত পড়াই শুধু নয়, রাতের অন্ধকারে বাড়ি বাড়িতে দেশব্রতী জানালা দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়ে আসতাম। '৭৫ সালে আমি গ্রেফতার হয়ে যাই। '৭৬-এ যখন বের হই, তখন সব ভেঙেচুরে গেছে, মানুষ আর আগের মতো আসে না। চারু মজুমদার, সরোজ দত্তের আত্মত্যাগের কথা জানতাম, হতাশা আসেনি তাই। কিন্তু পার্টিকে খুঁজে বেড়াতাম। ট্রেনে করে কোথাও যাচ্ছি, মানুষ ট্রেনের জানালা দিয়ে গাছপালা ঘরবাড়ি দেখে - আমি খুঁজতাম পার্টির পোস্টার বা দেওয়ালের লেখা। তারপর কী করে আবার বিপ্লবী রাজনীতিতে, শ্রমিকের লড়াইয়ে ফিরে এলাম, সে আরেক অধ্যায়।

আজকে যখন দেখি নকশালবাড়ির নাম নিয়ে এতগুলো রঙ-বেরঙের গ্রুপ, তাদের অনেকেই আবারভোটেও লড়ছে, সংশোধনবাদী রাজনীতি করছে, তখন আবার অনুভব করি কমরেড সরোজ দত্ত কতোটা নির্ভুল ছিলেন। সেই সত্তরের দশকেই কিন্তু তিনি আমাদের সতর্ক করে দিয়ে গিয়েছিলেন - "সাধু সাবধান! নকশালবাড়ি জাল হইতেছে!"


[সুশীল ঠাকুর নৈহাটি অঞ্চলের হুকুমচাঁদ জুট মিলের শ্রমিক ছিলেন, দফায় দফায় কারারুদ্ধ হয়েছেন ১৯৭৫, ১৯৯৪, ২০০৫ আর ২০১৫ সালে। এখন বিপ্লবী শ্রমিক সংগঠক।]

Comments


bottom of page