top of page

ভাষা যখন রাস্তা খুঁজে পায়

এ’বঙ্গে সাতের দশকেও বামপন্থী বিদ্বজন’ নামে এক কোমলমতি ও লিবারেল সমাজ ছিল। সে সমাজের চোখে সকলই ছিল শােভন, সকলইনবীন, সকলই বিমল। সে সমাজের নাগরিক পরিশীলন মােলায়েম মিথ্যেকেও মেনে নিতে পারত, কর্কশ সত্যিটাকে নয়। এহেন বিদ্বজনদের মধ্যে একদা জলচল সরােজ দত্ত প্রহ্লাদকূলে দৈত্য হয়ে উঠে দেশব্রতীর পাতায় যেদিন লিখলেন “এরাই যখন আবার ... দন্তবিকশিত করে সভাসমিতিতে স্তালিনের জয়ধ্বনি করে তখন ইচ্ছা করে লাথি মেরে শালাদের দাঁতের পাটি খসিয়ে দিই” সােমনাথ লাহিড়ী-ভবানী সেন-হীরেন মুখার্জিতে অভ্যস্ত সে বিদ্বজনেরা বড়ই ধাক্কা খেয়েছিলেন। ছিছিক্কার উঠেছিল - এই কি রাজনীতির ভাষা! এ তাে রাস্তার ভাষা!নজর করার মততা বিষয় হলাে, এই রাস্তার ভাষা’ লিখছেন তিনি, যাঁর কবিতার ধ্রুপদী বন্ধন একসময়ে বাংলার কবিকুলকে মুগ্ধ করে রাখত, যিনি সংস্কৃত ও ইংরেজি সাহিত্যে ব্যুৎপত্তির জন্য কলকাতার বুদ্ধিজীবী মহলে যথেষ্ট সম্মানিত ছিলেন, এবং অনুবাদক বা সাহিত্য-সাংবাদিক হিসাবেও মননশীল পাঠকের সম্ভ্রম আদায় করেছিলেন যিনি। সেই মানুষটি যখন রাস্তার ভাষায় কলম ধরেন তখন বােঝা দরকার সেটা তাঁর ভাষার দীনতা নয়, তিনি সেটা সচেতনভাবে করছেন, অর্থাৎ সচেতনভাবেই নিজেকে ‘রিডিউস’ করছেন। ভাষায় ও সাহিত্যে যাঁর দখল অনস্বীকার্যভাবে আছে - তাঁর পক্ষে বুদ্ধিজীবীর গুমর চিরতরে ছেড়ে নিজেকে এভাবে ‘রিডিউস’ করাটা খুব সহজ প্রক্রিয়া নয়। অন্য কেউ পারেননি। সরােজ দত্ত পেরেছিলেন, কারণ তিনি বিপ্লববিলাসী ছিলেন না, রাষ্ট্রের সঙ্গে বিপ্লব বিপ্লব খেলার সঙ্গীদের দল থেকে নাম কাটিয়ে তিনি বিপ্লবকে রােজকার কাজ হিসাবে নিতে পেরেছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে সরােজ দত্ত ইশতেহার লিখছিলেন। হয়তাে যে গলি পেরিয়ে একটি ঘরে তিনি লিখতে বসেছিলেন, সে গলি থেকে তাঁর কমরেডদের রক্তের দাগ শুকোয়নি তখনও। সহযােদ্ধাদের হত্যাকারীর প্রতি তাঁর ঘৃণা আদৌ নৈরাজ্যের ঘৃণা ছিল না, শ্রেণির ঘৃণা ছিল। শশাঙ্কের কলাম লেখা সরােজ দত্তের কাছে রাইফেলের নল পরিষ্কার রাখার মতােই যুদ্ধকালীন বাধ্যতা ছিল। সে কারণেই শ্রেণিঘৃনাকে নরম সরম করে, সহনীয় করে পরিবেশনের কোনও ইন্টেলেকচুয়ালি দায় তিনি বােধ করেননি। বামপন্থী বিদ্বজ্জনেরা’ আগুন বড়ই পছন্দ করেন, যদি তা হয় জোনাক পােকার পিছনের লুসিফেরাসের মতাে নরম ও ঠান্ডা, জ্বলবে কিন্তু জ্বালাবে না। সে আগুনে বিষম অরুচি ছিল সরােজ দত্তের। তিনি আগুনের বৃত্তে দাঁড়িয়েই স্ফুলিঙ্গ ও অঙ্গার থেকে ভাষার উপাদান খুঁজে নিয়েছিলেন, তাই তাঁর ভাষা এত সহজে আগ্নেয় হয়ে উঠতে পেরেছিল, সেকালের বামপন্থী মহলের মহাপন্ডিত তাত্ত্বিক বুদ্ধিজীবীদের মতাে তা ধোঁয়ায় আকীর্ণ ছিল না।

আর কেউ পারলেন না, সরােজ দত্ত পারলেন পরিশীলিত ভাষার আশ্রয় ছেড়ে প্রান্তিক মানুষের ভাষায় নেমে আসতে। পারলেন এই কারণে যে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে অনুভব করতে পেরেছিলেন, এ আসলে ‘নেমে আসা নয়, এটাই উত্তরণ। নির্দ্বিধায় বলা চলে, সরােজ দত্তের লেখার বিষয়বস্তুর মতাে তাঁর লেখার আঙ্গিকও শ্রেণির পক্ষ নিয়েছিল। সেটা ধরতে পেরেছিলেন শ্রমিকশ্রেণির অগ্রণী অংশ আর সমাজবদলের লড়াইয়ে সামিল তরুণেরা। মধ্যমেধাশাসিত বাংলার প্রথাগত বাম বুদ্ধিজীবী শিবিরের পক্ষে সরােজ দত্তের কলমের মতাে ভাষার উচ্চতাকে ধরতে পারার কথাইনয়। কারণ ওই সরােজ দত্ত যেমন বলতেন- প্রজাপতি ধরার জাল দিয়ে সিংহ ধরতে যাওয়াটাই মূঢ়তা।

bottom of page