top of page

মগন গহন ঘুমের ঘোরে যখন মূর্তি ভাঙলো : শশাঙ্কের কলমে

  • স্বপন দাসাধিকারী
  • Sep 27, 2021
  • 6 min read

প্রবন্ধ লেখার সময় কৈশোরিক অভ্যাসে আমরা সূচনা দিয়ে শুরু বিষয়ের বিভিন্ন দিক বিন্যস্ত করতে করতে উপসংহারে পৌঁছাই। আমাদের উত্তম উত্তম প্রবন্ধকাররা এর ব্যতিক্রম নন। আরিস্ততল রচনার গতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ছ’টি পর্বের কথা বলেছিলেন - প্রাথমিক ভাবে যা আসে তা অসংবদ্ধ, ঘটনার জন্য ঘটনা মনে হতে পারে। তারপর তা বিস্তৃত হয়ে পৌঁছায় উপসংহারে। সরোজ দত্তের, বা বলা উচিত শশাঙ্কের দেশব্রতী পর্যায়ের লেখাগুলি সাধারণভাবে এই ধরণটি মেনে চলে না। তিনি প্রথমেই জানিয়ে দেন তার সিদ্ধান্ত ; তারপর যান যুক্তি পরম্পরায়।


ধরা যাক 'মূর্তি ভাঙার সমর্থনে' লেখাটি। এটি ‘দেশব্রতী’তে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭০ সালের ২০শে আগস্ট। প্রথমেই শশাঙ্ক বলেন, ' বিপ্লবী ছাত্রদের মূর্তি ভাঙার অভিযানে প্রতিক্রিয়াশীল শাসক ও তাদের বেতনভুক দালাল বুদ্ধিজীবী মহলে কান্নাকাটি পড়ে গেছে' ইত্যাদি। এরপর তিনি এইসব বুদ্ধিজীবীদের 'হিস্টিরিয়া রোগীর মত গাঁজলা তোলা-র বর্ণনা দেবেন। তারপর বিস্তারে যাবেন মূর্তির নির্মাণ-বিনির্মাণের তাত্ত্বিক আলোচনায়। পূর্বপক্ষ হিসাবে নিজেই টেনে আনবেন ‘ওরা কী বলতে চায়’- এবং তার উত্তর দেবেন। উপসংহারে সতর্ক করবেন, “হুঁশিয়ার থাকতে হবে, প্রজাপতি ধরার জাল দিয়ে সিংহ ধরতে যাবার মৃঢ়তা আমাদের যেন পেয়ে না বসে’।


আমরা সে সময়কার নকশাল বা অ-নকশাল অভিজ্ঞতায় শুনেছি, ‘পত্রিকার দুনিয়ায়’ এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে সবাই প্রথমে শ্বাসরুদ্ধ করে পড়তেন বা শুনতেন শশাঙ্কর লেখা। যারা নকশাল তাদের মধ্যে সরোজ দত্তের লেখার প্রতি আবেগ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু যারা অ-নকশাল, এমনকি সরোজ দত্তের বিরোধী, তাঁরা কেন আবেগায়িত হতেন তাহলে? আসলে শশাঙ্কের লেখার মধ্যে এমন একটা আলাদা জোর ছিল যে তা মানুষকে ঘুরে ভাবতে বাধ্য করত। কিন্তু এই জোর সরোজ দত্তের লেখায় এল কি ভাবে, এবং সপ্তাহের পর সপ্তাহ? যদি ভাষাতাত্ত্বিক দিক দিয়ে ভাবি, তাহলে দেখব গদ্যের বিষয় ধারায় তিনি উপস্থিত করতেন চলমান সময় জীবনের উপমা, চিত্রকল্প, শরীরপ্রতিমা। দেখা যাক, বুদ্ধিজীবীদের চরিত্রকে স্পষ্ট করার জন্য ' মূর্তি ভাঙার সমর্থনে ' লেখায় তিনি কী কী তুলনা আনলেন।

১. উচ্ছিষ্টভোগী দালালদের এই হিস্টিরিয়ার চিৎকার

২. নকল তো নকল একেবারে মাছি মারা নকল

৩. সূর্যের আলোর মর্যাদা চাঁদের আলোর প্রাপ্য না হলেও ইত্যাদি

৪. বৃটিশের খয়ের খাঁ

৫. এই সারথির (রজনী পাম দত্ত) কাছেই রথী জ্যোতি বোস গীতার বাণী শ্রবণ করে এবং বিপ্লবী- বিশ্বরূপ দর্শনে বিপ্লবী দিব্যদৃষ্টি লাভ করে দেশে ফিরে আসে।


এছাড়া কিছু প্রবাদপ্রতিম বাক্যেরও জন্ম দিলেন, যেমন -

১. বীরত্ব ব্যক্তিগত নয়, বীরত্ব শ্রেনীগত।

২. প্রজাপতি ধরার জাল দিয়ে সিংহ ধরতে যাওয়ার মৃঢ়তা।

৩. নিজের আরসিতে যে মুখ ঝাপসা হয়ে যায়, শত্রুর আরসিতে তা যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

৪. নতুন মূর্তি মানেই নতুন রাজনীতি।


কিন্তু শুধু এই শব্দ ব্যবহারের মধ্যেই কি রচনা গুলি দিনের পর দিন এত জনপ্রিয় ছিল? অবশ্যই তা নয়, শব্দ, বাক্য টেনে নিয়ে যেত বিষয় বস্তুকে এবং এমন এক আবেগ তৈরি করত কবিতার মত যা মস্তিষ্ককে আলোড়িত করত। Poetry communicates before it is understood-এর মতোই। কবির সহজসংবদ্ধ আবেগ আমাদের হৃদয়কে সরাসরি বিদ্ধ করত। কিন্তু বিষয়ের সঙ্গেই সরোজ দত্ত সহজসংবদ্ধ হয়েছিলেন কি ভাবে? বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে ধূর্জটিপ্রসাদের আক্ষেপ বড় সত্যি --- বাংলা সাহিত্য বড় চাকরীর দরখাস্ত লেখার সামিল হয়েছে। যারা গরীব গৃহস্থের দুঃখে হা-হুতাশ করেন, তাঁরা লোক ভালো, কিন্তু রোম্যান্টিক। আমাদের সাহিত্য সৃষ্টির পিছনে তথ্য, ঘটনা, মূল্যায়নের কোন যথার্থ তাগিদ নেই। ‘মূল্যায়নের অভাব’ - এই দোষ কেউ দিতে পারবে না সরোজ দত্তকে, এমনকি বিরোধীরাও নয়। কিন্তু এই শ্রেনীগত মূল্যায়নের মনন সরোজ দত্তের মধ্যে গড়ে উঠল কী ভাবে? বস্তুত এই মানসিকতা এসেছিল তাঁর জীবনাচরণে, জীবনযাপনের শ্রেনীগত বিশ্বাসে।


সরোজ দত্ত শিশু বয়সে চালের বস্তা হাট থেকে মাথায় করে আনতেন। ১৯৪৫ সালে যুগান্তর-অমৃতবাজারে শ্রমিকদের সংগঠনে যুক্ত হয়েছিলেন সাংবাদিকরা এবং স্বভাবতই সরোজ দত্ত। ১৯৪৬ সালে পত্রিকার ধর্মঘটে শ্রমিকদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেলেন সরোজ দত্ত। চাকরি যাবার পর, অত নামী বুদ্ধিজীবী ও সুলেখক তিনি, কোনও পত্রিকা বা প্রকাশনা শুরু না করে সাথীদের নিয়ে করলেন কার্ডবোর্ড বাক্স তৈরির কারখানা, আঠা লাগিয়ে বাক্স তৈরিতে নিজের শ্রম দিতে শুরু করলেন। একই সঙ্গে পুরোপুরি পার্টিজান হয়ে গেলেন তিনি। কাগজের মালিক ও পুলিশের সঙ্গে সৌহার্দ ছিল তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ভিড়ে ভিড়াক্কার ধর্মতলায় তারাশঙ্কর গাড়ি থামিয়ে সরোজ দত্তকে উঠতে বললে সরোজ দত্তের তাৎক্ষণিক উত্তর – “আপনার গাড়িতে! ছিঃ! আমার ঠ্যাং নেই!” তাঁর ছিল একখানি ধুতি। এই ধুতি কেচে শুকিয়ে আবার পরে বেরোতেন কাজে। জীবনাচরণের এই ধরণটা সরোজ দত্ত সচেতনভাবেই মেনে চলতেন। স্বাধীনতা পত্রিকায় কাজের সময় হৈ হৈ করেছেন। বিষ্টু মুখোপাধ্যায় ছিলেন অতি সিরিয়াস। তিনি কাছে এসে চাপাসুরে বললেন, সরোজদা, একটু আস্তে, সরোজ দত্ত এক ধমক দিয়ে বললেন, তুমি থামো তো বিষ্টু, খবরের কাগজে খবর শুধু কলমে লেখা যায় না। এ কথা যে সরোজ দত্তের জীবনে কতখানি সত্যি, তা বোঝা যায় ‘দেশহিতৈষী’র সিদ্ধার্থ বা শশাঙ্কর লেখার সঙ্গে ‘দেশব্রতী’র শশাঙ্কর লেখার তুলনা করলে।

যাই হোক, জনগণ যেখানে সরোজ দত্ত সেখানে। স্বভাবতই তিনি সিপিএমে যোগ দিলেন, বিপ্লব হবে, পাশাপাশি থাকলেন সুশীতল রায়চৌধুরীর ইন্সটিটিউট অফ মার্কসিজম লেনিনিজমে। এর পর সিপিআই(এমএল)-এ থাকতে থাকতে তিনি আরও গভীরভাবে, অর্থবহভাবে দেখতে লাগলেন শ্রমিক, কৃষক, সাধারণ মানুষকে। এখন তাদের ভাষা উঠে আসতে লাগলো তার লেখায়। তিনি তুলে নিচ্ছিলেন দেওয়াল লিখনের ভাষাও। শৈবাল মিত্র স্মরণ করেছেন একটি দেওয়ালের লেখা -- ‘শুয়োরের বাচ্চা, অমুক কে কাঁটারি দিয়ে কাঁটব’। অত্যাচারী পুলিশ অফিসরকে দেওয়া ব্রাত্যজনের এই যুক্তিকে সরোজ দত্ত অশুদ্ধ বানানসহই ব্যবহার করেছিলেন। এই মানসিকতা থেকেই তিনি নজর করেছিলেন যে প্রতিক্রিয়াশীলরা খুন করে, কিন্তু তার যুক্তি হাজির করে সংশোধনবাদীরা। বাল্যবন্ধু বিনয় ঘোষ একবার নাকি বলেছিলেন, “নেহরুর রাজত্বে অনেক স্বাধীনতা আছে”। সরোজ দত্তের উত্তর ছিল, “গলায় শেকল দেওয়া কুকুর ঘেউ ঘেউ করে যতটা ছুটে যেতে পারে, ততটাই স্বাধীনতা আছে’; বাবা বিনয়, টাকাপয়সা খাচ্ছ খাও, তার জন্য ফিলোসফি তৈরি কোরো না”। সত্যিই, মার্কিন স্কলারশিপ নিতে তো বিবেকে বাধেনি বিনয় ঘোষের!


এই যাবতীয় দ্বিচারিতার বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে সরোজ দত্ত। লিখলেন মূর্তি ভাঙার লড়াই আসলে দুই রাজনীতির, দুই লাইনের লড়াই। দুই রাজনীতির লড়াই আমরা দিনের পর দিন দেখেছি — বলতে পারিনি, সরোজ দত্ত বললেন, হৈ হৈ পড়ে গেল — ছিছিক্কার উঠল, একদল বুদ্ধিজীবি — সন্তোষ ঘোষ, সুবোধ ঘোষ, প্রমথনাথ বিশী, মৈত্রেয়ী দেবী, সুনীতি চট্টোপাধ্যায়, অম্লান দত্ত, বুদ্ধদেব বসু ইত্যাদি দীর্ঘ দীর্ঘ বিবৃতি দিলেন৷ তার আগে ১৯৬২ সালে মনোজ বসু নিজের লেখা বই ‘চীন দেখে এলাম’ বইয়ের বহ্নুৎসব করলেন নিজের হাতে, সরোজ দত্ত ‘বই পোড়ানো প্রসঙ্গে’ আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন৷ ১৯৬২ সালে ন্যাশনাল লাইব্রেরি থেকে যত চীন ভারত সীমান্ত আর ম্যাপওয়ালা বই পাওয়া গিয়েছিল, সব পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। ১৯৭০ সালে দেশব্রর্তী অফিস থেকে গাদা গাদা বই বাজেয়াপ্ত করে ধ্বংস করেছে পুলিশ৷ ‘বই পোড়ানো প্রসঙ্গে’ প্রবন্ধটিকে বিস্তৃত করে সরোজ দত্ত এবার প্রশ্ন তুলেছেন যে আবহমানকাল ধরে শাসকশ্রেণী শোষিত শ্রেণীকে খুন করে আসছে, অথচ যখন শোষিত শ্রেণী শাসকশ্রেণী কে পাল্টা খতম করতে শুরু করল, তখন শুধু আইনশৃঙ্খলার যুক্তি তুলে, অর্থাৎ গান্ধীবাদ দিয়ে তা ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়৷


ওই ঠেকানোর চেষ্টার উদাহরণ সরোজ দত্ত স্পষ্টতর করেছেন ‘বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গে’ প্রবন্ধে৷ এই প্রবন্ধ নিয়ে আলোচনা উঠলেই পণ্ডিতন্মন্যরা বলতে থাকেন যে নকশালরা বিদ্যাসাগরকে না বুঝেই তাঁকে মুছে ফেলার জন্য হঠকারী কাজকর্ম, যেমন বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা ইত্যাদি করে যাচ্ছে, এবং তাকে মান্যতা দিচ্ছেন স্বয়ং শশাঙ্কর লেখা। অথচ সরোজ দত্তর প্রবন্ধটির মূল কথা ছিল, শাসকশ্রেণী কিভাবে বিদ্যাসাগরকে ব্যবহার করছে, কীভাবে বিদ্যাসাগরকে দিয়ে বিপ্লব ঠেকাতে চাইছে৷ মেদিনীপুরে ইংরেজদের তখন দুর্দিন চলছিল — তিন তিনজন ম্যাজিস্ট্রেট খতম হল — পেডি , বার্জ আর ডগলাস৷ দায়িত্বে নিয়ে আসা হল এ’দেশি সিভিল সারভেন্ট বিনয়রঞ্জন সেনকে । বি আর সেন একদিকে ব্রিটিশরাজের হয়ে চূড়ান্ত স্বৈরাচার চালিয়ে গেলেন, অন্যদিকে কৌশলগতভাবে প্রবল সংস্কৃতিমান হয়ে উঠলেন — ‘সে কী! মেদিনীপুর বিদ্যাসাগরকে ভুলে গেল?’ শুরু হলো মহাআড়ম্বরে বিদ্যাসাগর-কীর্তন। এখানেই সরোজ দত্তের সহৃদয় প্রশ্ন — কেন, ক্ষুদিরামও কি মেদিনীপুরের নন? অর্থাৎ ক্ষুদিরামদের ঠেকাতে বিদ্যাসাগরকে ব্যবহার করার কুশলী ছকটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন আমাদের।


সরোজ দত্ত কিন্তু বিদ্যাসাগরকে অস্বীকার করেননি৷ প্রবন্ধটির তৃতীয় লাইন দেখুন — ‘যে বিদ্যাসাগর এতদিন ছিল একজন নিরামিষ সমাজ সংস্কারক তাকে খাড়া করা হল একজন ‘সমাজবিপ্লবের নায়ক রূপে’৷এই সরোজ দত্তই স্বাধীনতা পত্রিকায় মাইকেল মধুসূদন দত্তকে নিয়ে সীতাংশু মৈত্রের বইয়ের আলোচনা করতে গিয়েবলেছিলেন, মধুসূদনের সঙ্গে নবীন বুর্জোয়া শ্রেণীর সংঘাত শুধু শোচনীয় পরাজয়ের ইতিহাস নয়, ব্যাপক ও তীব্র শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস বটে৷


পাঠক ‘শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস’ শব্দবন্ধটি নজর করুন৷ শ্রেণীসংগ্রামের সঙ্গে যাঁরা নেই, নির্যাতিত কৃষকের সঙ্গে যাঁরা নেই, ইংরেজদের শাসন শোষণের বিরুদ্ধে যাঁরা নেই, সরোজ দত্ত তাঁদের সঙ্গে নেই৷ বস্তুত সরোজ দত্ত যখন মূর্তি ভাঙার সমর্থনে প্রবন্ধ লিখলেন ২০ শে আগস্ট ১৯৭০-এ, তখন মূর্তি ভাঙা চলছে৷ সরোজ দত্ত বলছেন, যাঁরা মূর্তি ভাঙছেন তাঁরা সবাই সি পি আই (এম এল) নন৷ তারা সবাই সি পি আই (এম এল)-র নির্দেশ মেনে চলেন, এমন কথা নেই৷ কেন্দ্রীয় নির্দেশের অপেক্ষায় বসে না থাকে পার্টির যুবছাত্ররা কেন্দ্রীয় রাজনীতি ও জনতার মেজাজ অনুযায়ী এই আন্দোলনের সূত্রপাত করেন৷ সরোজ দত্তরা একে থামাতে গেলেন না৷ প্রশ্ন ওঠে, তাহলে পার্টির কাজ কি? সরোজ দত্ত বললেন, "পাটির কাজ আন্দোলনের উৎসের কথা সর্বক্ষণ যুবছাত্রদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া৷ পার্টির কাজ ওর বেশি নয়। পার্টি গুহামুখ থেকে ঠেলে পাথর সরিযে দিয়েছে,, উন্মুক্ত জলস্রোত যা নীচে নামছে তত প্রবল ও ব্যাপক হচ্ছে৷ তার সামনে বেত হাতে দাঁড়িয়ে ‘ওদিকে যেও না, ‘ও ক্ষেত ভাসিও না, ‘ও গ্রাম ডুবিও না, বলে মাস্টারী করার মতো মূঢ় আমাদের পার্টি নয়"৷ অর্থাৎ পার্টির কাজ ‘তাকে গ্রহণ করা generalise করা এবং নূতন পর্যায়ে উন্নীত করা — মাও ৎসে তুঙের নেতৃত্বে চীনের কমিউনিটি পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এই পথই গ্রহণ করেছেন৷ একেই তাঁরা বলেন Mass Line"৷ সরোজ দত্ত এই প্রয়োজনীয় কাজটাই সেদিন করেছিলেন — মূর্তিভাঙার রাজনীতিকে সাধারণীকরণ করেছিলেন, বা বলা ভালো তাকে একটা তাত্বিক ভিত্তি দিয়েছিলেন৷


সরোজ দত্ত অপ্রিয় প্রশ্ন তুলে রোষের শিকার হয়েছিলেন বহু বুদ্ধিজীবীর, কিন্তু যে প্রশ্ন সেদিন তিনি তুলেছিলেন তার উত্তরও কিন্তু জানা ছিল না তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের। তর্কবিতর্ক চলেছে সমানে। বিনয় ঘোষকেও শেষ পর্যন্ত লিখতে হয়েছিল যে আমরা যাকে বঙ্গীয় নবজাগরণ বলে থাকি তা ছিল স্রেফ এক ঐতিহাসিক তামাশা। প্রচলিত ইতিহাসকে, সেই ইতিহাস সযত্নে আমাদের মানসে যে মূর্তিগুলিকে নির্মাণ করে চলে, তাকে পুনর্বিচার আর বিনির্মাণের ধারাটির জন্মই দিয়েছিলেন সরোজ দত্ত। বিনির্মাণ পুনর্নির্মাণেরও দাবি রাখে। রাজনৈতিক জীবনেও সে দায়কে সরোজ দত্ত অস্বীকার করেননি। আগ্নেয় সময়ের সেই দাবি মেনেই সরোজ দত্ত সংশোধনবাদের অচলায়তনকে ভেঙে জনমানসে নির্মাণ করেছিলেন চারু মজুমদারের মূর্তির তাত্ত্বিক ভিত। সে ভিত মোটেই আবেগসর্বস্ব নড়বড়ে কোনো বনিয়াদ ছিল না। সরোজ দত্তের শিরচ্ছেদ করেও তাই রাষ্ট্র কিন্তু মানুষের মনে জাগরুক চারু মজুমদারের সেই মূর্তিকে গুঁড়িয়ে দিতে পারল না আজও। লড়াই জারি রইল।



ree

দেশব্রতী-র ১৯৬৯, ১৭ জুলাই সংখ্যায় সরোজ দত্তের কলাম পত্রিকার দুনিয়ায়

Comments


bottom of page