"কেননা এ অন্ধকারে শেষ যুদ্ধ বাকি"
- প্রতিরোধের ভাষা

- Sep 30, 2021
- 2 min read
কাঞ্চন কুমার

কাঞ্চন কুমার নামটি রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ছেলে যে এত 'অরাবীন্দ্রিক' হয়ে উঠবে কাল গড়ালে, তা না ভেবেই বোধ হয়। নামের পিছন থেকে 'মুখোপাধ্যায়' ছেঁটে ফেলে দিয়েছেন সেই কবে, বর্ণভেদের প্রতিবাদে। বর্ধমানের বিরূডিহা গ্রামে জন্ম, বেড়ে ওঠা বেনারসের জলহাওয়ায়। বাবা ছিলেন নামী কবি, বাংলার বিশিষ্ট কবিকূলে আদৃত। ছেলে বেছে নিলেন আভাঁ গার্দ সাহিত্যের আঙিনাকে। লিখতেন হিন্দিতে। 'পাষাণকন্যা'র মতো উপন্যাস লিখে অল্প বয়সেই অন্যধারার হিন্দি ঔপন্যাসিক হিসাবে নজর কেড়েছিলেন। সম্পাদনা করতেন 'আমুখ' পত্রিকার, যে পত্রিকাটিকে প্রগতিশীল হিন্দি সাহিত্যে একটা মাইলফলক ধরা হতো। শুরুর দিকে হিন্দি পাঠকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছেন হাংরি জেনারেশন কবিদের, সময় কাটিয়েছেন অ্যালেন গীন্সবার্গের সঙ্গে। '৬৭-তে নকশালবাড়ি আমূল বাঁকবদল ঘটিয়ে দিল সাহিত্যচিন্তার। উপলব্ধি করলেন, দিশাহীন 'বিদ্রোহী' সাহিত্য বাঙ্ময় প্রতিবাদটুকুই করতে পারে মাত্র, প্রতিরোধ নয়। সময় শুনতে চাইছিল প্রতিরোধের ভাষা। তাই বিদ্রোহী পত্রিকা থেকে 'আমুখ' হয়ে উঠল বিপ্লবী সাহিত্যের মুখপত্র। সেই সময় থেকে চারু মজুমদারের একনিষ্ঠ সৈনিক হিসাবে, বিপ্লবের প্রতি, জনগণের প্রতি যে দায়বদ্ধতাকে অবধারিত জ্ঞানে স্বীকার করে নিয়েছিলেন কাঞ্চন কুমার, অর্ধশতক পেরিয়ে আজো অটুট থেকে গেছেন সেই দায়বোধে।
হিন্দি সাহিত্যরসিকরা বলেন রাজনৈতিকভাবে এতটা 'কমিটেড' না হয়ে উপন্যাস লেখা চালিয়ে গেলে আজ তাঁর নাম আসত সমকালীন হিন্দি সাহিত্যের প্রথম সারিতে। কিন্তু কাঞ্চন কুমার ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠা পাওয়ার থেকে বিপ্লবী রাজনীতি আর সাহিত্যকে জনগণের মধ্যে পৌঁছে দেওয়াকে অনেক জরুরি মনে করেছিলেন। বেনারসের পর দিল্লি হয়ে কলকাতায় এসে উঠেছিলেন ২০০২-এ। ওই সময় থেকেই হিন্দির বদলে বাংলায় নিয়মিত লেখালিখির শুরু। মৌলিক রচনার বদলে অন্য ভাষার প্রতিরোধ সাহিত্যের অনুবাদ করাকে বেশি জরুরি মনে করেছিলেন। অনুবাদ করেছেন অটো রেনে কাস্তিইয়ো, উনেসিমা সিলবেটাই, বেঞ্জামিন মোলায়েস, কেন সারো-বিওয়া, হোসে মারিয়া সিসন, ভিক্টর জেসিন্টো বা গ্ঞুগি ওয়া থিয়োংগো-র কবিতা, গদ্য। বাংলার পাঠককে অবিচ্ছিন্নভাবে উদ্দীপ্ত করে গেছেন চেরবন্ডা রাজু বা ওয়রওয়র রাওয়ের মতো তেলুগু কবিদের কবিতার অনুবাদ পড়িয়ে। তেমনই তাঁর হিন্দি অনুবাদেই বাংলার বাইরের পাঠক জেনেছেন শহিদ সরোজ দত্ত বা দ্রোণাচার্য ঘোষের কবিতাকে (আগামীকাল আমরা তাঁর লিখিত, অনুদিত, সম্পাদিত বইগুলির সচিত্র একটি তালিকা প্রকাশ করব, তাতে কাঞ্চন কুমারের কাজকর্মের ব্যাপ্তি সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যাবে)। অল ইন্ডিয়া লিগ ফর রেভোলিউশনারি কালচার-এরও অন্যতম অগ্রণী মুখ ছিলেন কাঞ্চন কুমার, ওয়রওয়র রাও প্রমুখের সাথে।
কাঞ্চন কুমারের বয়স ৮৫ পেরিয়েছে। চিন্তায়, কর্মে, বিপ্লবের প্রতি বিশ্বাসে, জনগণের উপর ভালোবাসায় এখনো উজ্জীবিত রয়েছেন ৫০ বছর আগের সেই দিনগুলির মতোই – এই সংখ্যায় লাল সিংহ দিলের সাত্তি কবিতার অনুবাদ তারই সাক্ষ্য দেয়।




Comments