"লালের স্বপ্নে অগাধ আলোয় আমাকে ভরিয়ে দিও।"
- প্রতিরোধের ভাষা

- Sep 22, 2021
- 2 min read
দ্রোণাচার্য ঘোষ

"তবে তাই হোক, তোমার গভীরে যাবার কালেই প্রিয়,
লালের স্বপ্নে অগাধ আলোয় আমাকে ভরিয়ে দিও।"
১৯৭১-এর এপ্রিল মাস। হুগলির এক পুলিশ কর্মী প্রতিবেশী এক বয়স্কা মহিলাকে এসে জানালেন - "আজ একটা বাপের ব্যাটাকে দেখে এলাম! সত্যি বাঘের বাচ্চা! একটুও মাথাটা নোয়ালো না"! ওই মহিলার মেয়ে ছিলেন সি.পি.আই. (এম.এল.)-এর সক্রিয় কর্মী। তাঁর মুখ থেকেই পরে কমরেডরা জানতে পেরেছিলেন এক মহাকাব্যিক আখ্যান।
সে 'বাঘের বাচ্চা'র নাম ছিল দ্রোণাচার্য ঘোষ। ১৯৭১-এর পয়লা এপ্রিল আরো দু'জন কমরেডের সাথে মিলে হাঁসগড়ায় সফল অ্যাকশন করবার পর পাশের ডেমরা গ্রামে ধরা পড়েন। থানায় অকথ্য অত্যাচার করে তাঁর হাত পা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, গায়ে ঢেলে দেওয়া হয়েছিল রাস্তা সারাইয়ের গরম আলকাতরা। পেটাতে পেটাতে পুলিশ অফিসার তাঁকে বলেছিল "বল শালা মাও সে তুঙ শুয়োরের বাচ্চা! বল চারু মজুমদার শুয়োরের বাচ্চা! বল..."। রক্তাক্ত, ভাঙা শরীরে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগে দ্রোণাচার্য কোনরকমে উচ্চারণ করেছিলেন "মাও ৎসে তুঙ...", আর বিকৃত জয়ের হাসি ফুটে উঠছিল অফিসারের মুখে। সে হাসি অবশ্য মুখেই মিলিয়ে গিয়েছিল, যখন অতি কষ্টে টেনে টেনে দ্রোণাচার্য শেষ করেছিলেন, "... জিন্দাবাদ! কমরেড চারু মজুমদার লাল সেলাম"! শাসকের ক্রোধ তীব্রতর হয়ে তখন আবার আছড়ে পড়ছে তাঁর ভাঙা হাড়ের উপর, তিনি জ্ঞান হারিয়েছিলেন।
দারিদ্রপীড়িত পরিবারের সন্তান দ্রোণের রক্তে ছিল দ্রোহ, প্রেম ও কবিতা। বাংলা কবিতার অনেক একনিষ্ঠ পাঠকই মনে করেছেন, তিনি বেঁচে থাকলে আমরা বাংলাভাষায় একজন পাবলো নেরুদা বা নাজ়িম হিকমতকে পেতাম। ১৯৬৮-র ১১ সেপ্টেম্বরের ডায়েরিতে দ্রোণ লিখছেন রাজনীতি তাঁর মজ্জায় ঢুকে গেছে। সেই আলোতে তাঁকে বদলাতে হবে তাঁর কবিতা। ১৯৬৭ তে নকশালবাড়ির কৃষক অভ্যুত্থান আমূল বাঁকবদল ঘটিয়েছিল তাঁর চেতনায়। বিপ্লবের জন্য ঘর ছেড়েছিলেন তিনি, জীবনের শেষ মুহূর্তটি অবধি রয়ে গিয়েছিলেন সি.পি.আই. (এম.এল.)-এর দ্বিধাহীন, অগ্রণী সৈনিক।
দ্রোণ জেলে কোনোরকম আইনি সাহায্য নিতে অস্বীকার করেছিলেন। ১৯৭২-এর ফেব্রুয়ারিতে হুগলি জেল ব্রেক করে বেরোতে গিয়ে দ্রোণ শহিদ হন। গুলি করে মারা হয়নি তাঁকে। গুপ্তি দিয়ে গেঁথে পুলিশ তাঁর শরীর এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়েছিল, মুখের হাড় চূর্ণ করে দিয়েছিল। দ্রোণের বন্ধু, এলাকার পরিচিত গুন্ডা প্রশান্ত (পান্ত) তখন ওই জেলেই কয়েদি ছিলেন, তিনি ছুটে এসে মৃত্যুপথযাত্রী অগ্রজপ্রতিম বন্ধুর মাথাটা কোলে তুলে নেন। মারা যাওয়ার আগে অস্ফূটে দ্রোণাচার্য তাঁকে বলেছিলেন, "ওই গানটা আমাকে একবার শোনাতে পারিস? ওই যে ... "ভাগীরথী তুমি মেকং নদীর সীমানা ভাঙো... খবর আনো, খবর আনো..."
সেদিনটি ছিল ফেব্রুয়ারির ৭, আজ থেকে ঠিক উনপঞ্চাশ বছর আগে। আজ, ৭ ফেব্রুয়ারি, আরো একবার রক্তপতাকা অর্ধনমিত রাখবার দিন।
তীব্রতম প্রেম থেকে দ্রোহ হয়ে বিপ্লবের জন্য তাঁর কবিতার সৃজন। কবিতা ও বিপ্লব নিয়ে বেঁচেছিলেন দ্রোণাচার্য, কবিতা ও বিপ্লব বুকে নিয়েই শহিদের মৃত্যুর গৌরব অর্জন করেছিলেন। কবিতার বদলে যাওয়ার এই দৃঢ় প্রত্যয়ী অভিযাত্রার সাক্ষী থাকতে দ্রোণাচার্যের কবিতা আমাদের অবশ্যপাঠ্য।বুঝবার জন্য, সময় কীভাবে একজন প্রেমী ও বিদ্রোহী কবিকে বিপ্লবের পক্ষে, জনগণের পক্ষে দাঁড়াতে বাধ্য করে।
এই শ্রদ্ধার্ঘ রচনায় প্রতিরোধের ভাষা-কে সহায়তা করেছেন কৃষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় ও স্বপন দাসাধিকারী।




Comments