বাংলার পার্টি প্রভাবিত শিল্প সাহিত্যে শোধনবাদীদের ভূমিকা
- সরোজ দত্ত

- Oct 1, 2021
- 11 min read
Updated: Nov 11, 2021
“সন্ধ্যাবেলায় দীপ জ্বালানোর আগে সকালবেলায় সলতে পাকানোর মত” ভূমিকা হিসাবে কয়েকটা কথা বলা দরকার। আজ থেকে পঁয়ত্রিশ বছর আগেকার কথা। বিশ্বধনতন্ত্র তখন তীব্র সঙ্কটের আবর্তে পড়েছে, দেখা দিয়েছে বিশ্ব বাণিজ্যিক মন্দা। বিশ্বধনতন্ত্রের মূল ঘাঁটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ সঙ্কটের অভিব্যক্তি স্বভাবতঃই তখন প্রকটতম। বেকারের সংখ্যা বেড়ে চলেছে হু হু করে দিনের পর দিন, দলে দলে দিশেহারা মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে অন্ন ও কাজের সন্ধানে, সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে চলেছে মস্তিষ্কবিকৃতি, আত্মপীড়ন, আত্মক্ষয়, আত্মহত্যা ও যৌন উদভ্রান্তি। অগ্রসর অনগ্রসর প্রত্যেক পুঁজিবাদী দেশেরই তখন অল্পবিস্তর এ অবস্থা। ওদিকে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে পৃথিবীর এক ষষ্ঠমাংশে; সে এলাকা এ সঙ্কট থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত এবং পরমাশ্চর্য উদ্দীপনা ও আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের কাজ হাতে নিয়েছে। সাজ সাজ রব পড়ে গেল পুঁজিবাদী শাসকমহলে! পাছে সোভিয়েতের জীবন্ত দৃষ্টান্ত ও বৈপ্লবিক সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা পুঁজিবাদী দুনিয়ার জনজীবনে পরিব্যাপ্ত হয়ে পড়ে তাই একদিকে যেমন তারা কঠোর পুলিশী ব্যবস্থার আশ্রয় নিলেন, অন্যদিকে তেমনই পাল্টা প্রচারের জন্য ভাড়াটিয়া লেখকদের নিয়োগ করলেন। প্রকাশিত হলো মুমূর্ষ ধনতন্ত্রের মকরধ্বজরূপ কিনসের অর্থনীতি, পূর্ণমাত্রায় কাজে লাগানো হলো বস্তুবাদের মোড়কে ভাববাদী ফ্রয়েডীয় দর্শনকে, বিক্ষোভ পাছে বিপ্লবী রূপ নেয় তাই শিল্পসাহিত্যে সর্বপ্রকারের বুর্জোয়া অবক্ষয়ী চিন্তাকে বিপ্লবীয়ানার ছদ্মবেশ পরিয়ে উপস্থিত করা হলো! বছর দশেক আগে জার্মান কমিউনিস্ট নেত্রী ক্লারা জেটকিনের সঙ্গে আলোচনাকালে লেনিন এ সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলেন, বলেছিলেন এসব বিপ্লবীয়ানার সঙ্গে শ্রমিকশ্রেণীর কোনও সম্পর্ক নেই” (Proletariat has got nothing to do with it)।
বলা বাহুল্য, ইংরেজশাসিত উপনিবেশ ভারতবর্ষও তখন এই বিশ্বধনতান্ত্রিক সংকটের আবর্তে পড়েছে। সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংকটও অনিবার্যভাবেই দেখা দিয়েছে। কয়েক বছর আগে ১৯২৫ সালে প্রাচ্য জনগণের বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা প্রসঙ্গে মরেড স্তালিন উপনিবেশিক দুনিয়ার তদানীন্তন অবস্থা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছিলেন, অন্যান্য উপনিবেশের তুলনায় ভারতবর্ষে ধনতন্ত্র অপেক্ষাকৃত পরিণত! এই পরিণত অবস্থার জন্য সংকট এখানে অপেক্ষাকৃত তীব্র হয়। বিদেশী পুঁজির পীঠস্থান বৃহত্তর কলকাতা তথা বাংলাদেশে সংকট যে বিশেষভাবে অনুভূত হবে তাতে বিস্ময়ের কিছু নাই। এ প্রবন্ধ বাংলাদেশের সংকটের ক্ষেত্রেই আমরা সীমাবদ্ধ রাখব। তখন আমাদের দেশে (এবং এখনও) শিল্পসাহিত্যের কারবারী মূলত শিক্ষিত পেটিবুর্জোয়াশ্রেণী। জমিদারশ্রেণীর যাঁরা দু-একজন এ কারবারে লিপ্ত ছিলেন তাঁরও নির্ভরশীল ছিলেন এঁদেরই উপর। সেই শিক্ষিত পেটিবুর্জোয়াশ্রেণী ধনতান্ত্রিক সংকটে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে দিশেহারা হয়ে গেল। এঁদের একাংশ ইতিপূবেই বিদেশী শাসন উচ্ছেদের জন্য পেটিবুর্জোয়াদের সশস্ত্র অভুত্থানের পথ গ্রহণ করেছিল যা সামাজিক ঐতিহাসিক কারণে অনিবার্যভাবেই শোচনীয় ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। আর এক অংশ যাঁরা ছিলেন শিল্পসাহিত্যের তরুণ কারবারী, প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাঁদের ক্রোধ ও ক্ষোভকে সাম্রাজ্যবাদ প্রচারের কৌশল বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করে শেষপর্যন্ত নিজেদেরই স্বার্থসিদ্ধির সহায়ক করে তোলে।
সংকট দ্রুতভাবে এগিয়ে চলল! শিক্ষিত বেকারে দেশ ভরে গেল, মস্তিষ্কবিকৃতি ও আত্মহত্যার সংখ্যা বেড়ে চলল, অফিসে অফিসে তাদের ধর্না ও কাকুতি এবং লব্ধচাকুরী ভাগ্যবানদের পীড়িত পদানত ক্রীতদাসের জীবন আবহাওয়াকে সর্বক্ষণের জন্য ভারাক্রান্ত করে রাখল। এদিকে রাজনৈতিক গগনও ঘনমেঘে আচ্ছন্ন হয়ে উঠল। আপসকামী বুর্জোয়া নেতৃত্বের বিশ্বাসঘাতকতায় জাতীয় মুক্তি আন্দোলন তখন ভেঙে গেছে, সঙ্গে সঙ্গে নিভে গেছে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের দীপশিখা। শিক্ষিত পেটিবুর্জোয়ার চোখের সামনে তখন ভবিষ্যত বলতে একটা বিভীষিকার কালো পর্দা। দেশে বৈজ্ঞানিক সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার প্রবেশপথ পুলিশী প্রহরার শ্যেনদৃষ্টিতে অবরুদ্ধ। কিন্তু যুদ্ধোত্তর ইউরোপের চমকপ্রদ বুর্জোয়া অবক্ষয়ী সাহিত্য, প্রতিবিপ্লবী ফ্রয়েডীয় দর্শন এবং উচ্চকিত ফ্যাসিস্ত রাজনৈতিক সাহিত্যের প্রবেশ শুধু উন্মুক্ত নয়, বিশেষভাবে উৎসাহিতও বটে। হতাশা ও নৈরাশ্যের এই দিকচিহ্নহীন অন্ধকারে আমাদের তরুণ মসীজীবিরা বুকজ্বালা তৃষ্ণা মেটানোর জন্য আকণ্ঠ এই নর্দমার জল পান করতে লাগলেন। শ্বাসরোধকারী পরিবেশের বিরুদ্ধে তাদের সঙ্গত, স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভকে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রযন্ত্র ও প্রচারযন্ত্র কিভাবে বিকৃত ও বিভ্রান্ত করে নিজেদেরই স্বার্থসাধনে নিয়োজিত করল, তা তাঁরা টের পেলেন না। নয়া ইউরোপ থেকে তারা বাংলা সাহিত্যে আমদানী করলেন অলডাস হাক্সলি, নুট হামসুন ও টি. এস. এলিয়টকে; গোর্কি, নেক্সো ও মায়াকোভস্কির সন্ধান তারা পেলেন না। কল্লোল ও কালিকলম গোষ্ঠীর মধ্যে অবশ্য এমন সাহিত্যিক নিশ্চয়ই ছিলেন যাঁরা এই অপবিদ্রোহের মধ্যেও প্রকৃত বিদ্রোহের কিছুটা চেষ্টা করেছিলেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, শৈলজা মুখোপাধ্যায় ও প্রেমেন্দ্র মিত্রকে এই পংক্তিতে ফেলা যায়। বিশেষ করে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অবক্ষয়কে গ্রহণ করেও কেমন যেন একটা অতৃপ্তি অস্থিরতা থেকে গিয়েছিল; তিনি যেন সর্বক্ষণ পথ খুঁজছিলেন। তাই পরবর্তীকালে তিনি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রবাদ গ্রহণ করে বাংলা কথাসাহিত্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করতে পেরেছিলেন।
এই শতকের চতুর্থ দশকের মাঝামাঝি থেকে বলা চলে অবস্থার পরিবর্তন হতে শুরু করল। বে-আইনী আত্মগোপনকারী কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাব জাতীয় রাজনীতিতে এবং বিশেষভাবে পেটিবুর্জোয়া তরুণ সম্প্রদায়ের উপর পড়তে শুরু করল। একদিকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সোভিয়েত ইউনিয়নের পাঁচশালা পরিকল্পনার অভাবিত সাফল্য, চীনের জাপবিরোধী সংগ্রাম ও স্পেনের গৃহযুদ্ধ এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একটা আন্তর্জাতিক গণবিক্ষোভ এবং জাতীয়ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের সূচনা কমিউনিস্ট পার্টি ও তার মতাদর্শকে জনচিত্তে একটা মর্যাদার আসন দিল। ইংরাজের বন্দীশিবিরে শত শত তরুণ রাজবন্দীর একটা বিপুল বৃহদাংশ বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রবাদ গ্রহণ করলেন। ক্রমে তারা যখন বেরিয়ে এলেন তখন দেশের রাজনৈতিক আবহাওয়ায় একটা বড় রকমের পরিবর্তন ঘটল।
এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবক্ষয়ী সাহিত্যিকদের ভূমিকা বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। এক আত্মকেন্দ্রিক, গোষ্ঠীকেন্দ্রিক, জনবিদ্বেষী, অবাস্তব ও দুর্বোধ্য সাহিত্য সাধনার ফলে এঁদের অবস্থা ইতিমধ্যেই নিভে যাওয়া হাউই কাঠির মত হয়ে এসেছিল। দেশে, বিশেষতঃ বাংলাদেশে কমিউনিস্ট পার্টি ও কমিউনিজমের মর্যাদা তখন ঊর্ধ্বমুখীন। কমিউনিজম তখন প্রায় একটা ফ্যাসন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিলুপ্তির মুখে দাঁড়িয়ে পুনরুজ্জীবনের এমন সুযোগ তাঁরা ছাড়লেন না। তাদের মুখপাত্রেরা ঘোষণা করলেন যে তারা কমিউনিস্ট পার্টি ও কমিউনিজমের দরদী। সমর্থক। শুধু এইটুকু বললে ক্ষতি ছিলনা বরং ভাবা যেত তাঁরা হয়তো নতুনভাবে সাহিত্যজীবন শুরু করার কথা ভাবছেন। কিন্তু তা নয়। তাঁরা বললেন যে তাঁদের অতীতের সমস্ত সাহিত্য সাধনাই কমিউনিজমের পরিপোষক। ১৯৩৯ সালের শেষদিকে চীনের জাপবিরোধী সংগ্রাম ও স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের আন্তর্জাতিক উদ্দীপনার পরিপ্রেক্ষিতে কলকাতায় যে সারা ভারত প্রগতি সাহিত্য সম্মেলন হয় তাতে তারা দুটি পঠিত প্রবন্ধে ঠিক এই কথাই ঘোষণা করেন।
এই প্রবন্ধের মোটামুটি বক্তব্য ছিল এই: তাদের তৈরী সাহিত্যও একপ্রকার পণ্য, সাহিত্যকারখানার মালিকেরা অর্থাৎ পুস্তক প্রকাশকেরা ও পত্রিকার স্বত্বাধিকারীরা এই পণ্য বিক্রী করে মুনাফা করছেন, কিন্তু তাঁরা উপযুক্ত প্রাপ্য পাচ্ছেন না। তাই তাঁরাও সর্বহারা প্রলেতারিয়েট; অতএব তাদের সাহিত্যও প্রলেতারীয় সাহিত্য। দ্বিতীয় প্রবন্ধটির নাম In Defence of decadents অর্থাৎ অবক্ষয়ীদের সমর্থনে। এর বক্তব্য ছিল: যেহেতু অবক্ষয় বর্তমানে বুর্জোয়া সমাজের একটা বাস্তব অতএব একে চিত্রিত করাও (উদ্ঘাটন ও আক্রমণ না করে—লেখক) বুর্জোয়া বিরোধী বৈপ্লবীকতা। অতএব অবক্ষয়ী সাহিত্য কমিউনিজমের পরিপোষক। তখন মাসিক ‘অগ্রণী’ পত্রিকায় এই মতবাদের বুর্জোয়া সুবিধাবাদী রূপ উদঘাটন করে বর্তমান লেখক প্রবন্ধ লেখেন এবং তার ফলে ঐ পত্রিকাতেই দীর্ঘ বিতর্কের সৃষ্টি হয়। বিতর্ক কিছুটা চলার পর অবক্ষয়বাদীরা বোধহয় বিপন্ন বোধ করেই চুপ করে যান। কিন্তু খিড়কীর দ্বার দিয়েই এই দূষিত বুর্জোয়া অবক্ষয়ী ভাবধারা কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে ঢুকিয়ে দেবার চেষ্টা তারা ত্যাগ করেন না এবং এই কাজে কমিউনিস্ট পার্টির কিছু সাংস্কৃতিক নেতা তাদের সাহায্য ও সহযোগিতা করেন। দলপুষ্টির ব্যাপারে এরা এতই ব্যস্ত যে, মতবাদের লড়াইয়ে বিব্রত বােধ করতে থাকেন; তাছাড়া নিজেরাও তখন তারা অবক্ষয়ী চিন্তাধারায় কিছুটা আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছেন। এঁদের ভাবখানা ছিল এই যে, এই অবক্ষয়ীরা যখন তাদের যুগেরই সৃষ্টি” তখন তাদের আক্রমণ করা ঠিক নয়। এঁরা ছিলেন সবাই মার্কসীয় সাহিত্যের কেতাবী পণ্ডিত। কিন্তু তারা সবাই কার্ল মার্কসের এই বিখ্যাত উক্তিটি বেমালুম ভুলে গেলেন বা চেপে গেলেন “দুর্ভাগ্যবশতঃ প্রতিটি লােকই তার কালের সৃষ্টি এবং এটাই যদি কাউকে আক্রমণ করার পক্ষে যথেষ্ট হয়ে থাকে তবে তাে সকল বিরােধ, সকল সংগ্রামেরই অবসান ঘটে যায়।” এঁদেরই নিরলস চেষ্টায় এই অবক্ষয়বাদীরা কমিউনিস্ট পার্টির সহযাত্রীর আসনে সসম্মানে প্রতিষ্ঠিত হলেন। এমন কি এও দেখা গেল, যে খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবীটি মাত্র কয়েকদিন পূর্বে সংস্কৃতির কণ্ঠরােধে নাৎসী জার্মানী ও সােস্যালিস্ট রাশিয়াকে সমপর্যায়ে ফেলে প্রকাশ্যে স্বনামে প্রবন্ধ ছাপিয়েছেন, অনায়াসেই তাকে পার্টির সভ্যপদ দেওয়া হােল এবং কিছুদিন পরে সাংস্কৃতিক নেতার আসনেও উন্নীত করা হােল। দলপুষ্টির অত্যুৎসাহে ভুলে যাওয়া হােল লিউ শাউ চি’র সেই সতর্কবাণী যে, বুর্জোয়া পরিবেশ থেকে যখন কেউ পার্টিতে আসে তখন তাকে দুহাত বাড়িয়ে আলিঙ্গন করতে হবে বটে, কিন্তু তার আগে তাকে ভাল করে স্নান করিয়ে নিতে হবে। নতুবা তার গায়ে বুর্জোয়া কাদা থেকে যাবেই উপরন্তু পার্টির গায়েও সেই কাদা লাগবে।
দলপুষ্টির অত্যুগ্র আগ্রহে ধােলাই না করে আলিঙ্গন করার নীতির বিষময় ফল ফলতে দেরী হােল না। অচিরে দেখা গেল কমিউনিস্ট লেখকরা বাংলা দেশের কমিউনিস্ট সাহিত্যের পূর্বসুরী হিসাবে কল্লোল, কালিকলম গােষ্ঠীর নাম করছেন, নির্লজ্জের মত বলছেন তাদের ঐতিহ্যেরই উত্তরসাধক নাকি কমিউনিস্ট পার্টি। তারা ভুলে গেলেন বা বেমালুম চেপে গেলেন যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই লাঙ্গল’ ‘ধূমকেতু’ প্রভৃতি কাগজ মারফত মুজাফর আহম্মদ ও নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে একটা শক্তিশালী বৈপ্লবিক সাহিত্য আন্দোলন পুলিশীসন্ত্রাস ও পীড়ন উপেক্ষা করে প্রবাহিত হয়েছিল, যে আন্দোলন কমিউনিস্ট পার্টির গড়ার কাজে বিশেষ সহায়ক হয়েছিল। নজরুলের বিপ্লবীকাব্য ও আন্দোলনের অবদান; এ আন্দোলনই সর্বপ্রথম গাের্কির ‘মা’ উপন্যাসের সাথে বাঙ্গালি পাঠকের পরিচয় ঘটায়। এ আন্দোলনের বিচিত্র ইতিহাস বুর্জোয়া পাণ্ডিত্যের ষ্টীমরােলারের তলায় চাপা পড়ে গেছে এবং দুঃখের বিষয় কোন মার্কসবাদী গবেষক তাকে এযাবৎ উদ্ধারের চেষ্টা করেননি। সমাজতন্ত্রবাদীর এই প্রত্যক্ষ ঐতিহ্যের আগেও সাম্রাজ্যবাদ বিরােধী সামন্তবাদ বিরােধী যে অপ্রত্যক্ষ ঐতিহ্য মাইকেল থেকে রবীন্দ্রনাথ, এমনকি, সত্যেন দত্ত, যতীন সেনগুপ্তের রচনাবলীর বিপুল ও বলিষ্ঠ গণতান্ত্রিক অংশের মধ্যে নিহিত রয়েছে সেকথা তাে ছেড়েই দিলাম। মুষ্টিমেয়র অবক্ষয়ের অজীর্ণের উদগারকে যারা বাংলা দেশের শ্রমিক শ্রেণীর বিরাট সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পদের স্থলাভিষিক্ত করতে চেয়েছে তারা জ্ঞাতসারে হােক বা অজ্ঞাতসারে হােক বিপ্লবী আন্দোলনের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
‘জনযুদ্ধে’র আমলে পার্টির সুদৃঢ় শ্রমিক আন্তর্জাতিকতা ও বিশ্ব কমিউনিস্ট ঐক্যের প্রভাবে বুর্জোয়া পরিবেশ থেকে বহু লেখক ও শিল্পী পার্টির কাছে আসেন। কিন্তু পর্টি নেতৃত্বের চিন্তায়-চেতনায় তখন শােধনবাদ প্রবেশ করেছে। ফলে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী চিন্তাধারা প্রতিষ্ঠার উপর গুরুত্ব না দিয়ে তার অনুষঙ্গের পরিবর্তে বিকল্প হিসাবে ফ্রন্টগঠন ও দলপুষ্টির দিকে সর্বশক্তি নিয়ােগ করেন। ফল হয় মারাত্মক। এই ছিদ্রপথে পার্টির মধ্যে অবক্ষয়ী বুর্জোয়া এবং জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার শনি প্রবেশ করতে থাকে। পার্টি সাহিত্যে শ্রেণী উঠে গিয়ে সেখানে আসে জাতীয় জনগন। শ্রেণীসংগ্রাম, শ্রেণী সংঘর্ষ এবং তারই অগ্নিগর্ভ থেকে উদ্ভূত পজিটিভ চরিত্রের কোন কিছুরই সন্ধান পাওয়া যায় না পার্টি সাহিত্যে। নিপীড়িতের প্রতি একটা ভাবালু আবেগ এবং সাম্প্রদায়িক হানাহানির ক্ষেত্রে একটা শ্ৰেণীসম্পর্কহীন উদারনৈতিক শান্তির বেদনার্ত স্বস্তিবাচন ছাড়া আর কিছুরই সন্ধান পাওয়া যায় নি পার্টি সাহিত্যে। সুকান্ত ভট্টাচার্যের কাব্যে শ্রেনিসংগ্রামের ও জনগণের বৈপ্লবিক মেজাজের আবেগ পাওয়া যায়। তার কারণ সম্ভবতঃ তখনকার দুনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের নিপীড়িত জনগণের সশস্ত্র অভ্যুত্থানের সংবাদের একটা আশ্চর্য প্রতিক্রিয়া ঘটেছিল এই তরুণ কবির মানসলােকে যার ফলে সে পার্টির সাংস্কৃতিক দৃষ্টির শােধনবাদী উদারনীতির উর্ধ্বে উঠতে পেরেছিল। (ঠিক এর আগের যুগে ঢাকার তরুণ লেখক সােমেন চন্দের ক্ষণস্থায়ী জীবনেও তদানীন্তন অবক্ষয়ী চিন্তাধারার প্রাবল্য সত্ত্বেও প্রকৃত মার্কসবাদী-লেনিনবাদী শিল্পীসত্ত্বার আবির্ভাব ঘটেছে। মাত্র একুশ বছর বয়সে রাজনৈতিক গুপ্ত ঘাতকের হাতে তিনি নিহত হন।) পার্টির পাশে ও মধ্যে আসা আরও বহু শক্তিমান শিল্পী বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী অবদান রেখে গেছেন সন্দেহ নাই : বহু প্রত্যাশা করে তারা এসেছিলেন। কিন্তু মার্কসবাদ-লেনিনবাদের আলােক বর্তিকার অভাবে তারা বেশিদূর অগ্রসর হতে পারেননি। চিরায়ত মার্কসবাদী সাহিত্যের প্রতি অবজ্ঞাশীল তখনকার যােশী নেতৃত্ব তাদের জাতীয়তাবাদের উর্ধ্বে তুলে প্রলেতারীয় দৃষ্টিভঙ্গীতে দীক্ষিত হতে সাহায্য করেনি।
ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় সংগ্রামের স্বার্থে শ্রেণীসংগ্রামকে বিলুপ্ত করে দেবার প্রবণতা থেকেই এই শােধনবাদী চিন্তাধারার সৃষ্টি হয়। তাই পার্টি বা পার্টি প্রভাবিত শিল্পীরা প্রচণ্ড পরিশ্রম সত্ত্বেও শ্রমিকশ্রেণীকে তার নিজস্ব ভূমিকায় উদ্বুদ্ধ করতে পারেননি। যতদূর মনে পড়ে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের শহীদের ডাক' নামক মূক ছায়ানাট্যে ভারতে মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাসের যে স্মৃতিস্তম্ভগুলি তুলে ধরা হয় তাতে কানপুর কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মামলা বা মীরাট কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মামলার কথা ছিল না। বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার এই প্রাবল্যের ফলেই, এত সংখ্যক শক্তিমান শিল্পী কমিউনিস্ট পার্টির পাশে সমবেত হওয়া সত্ত্বেও শ্রমিকশ্রেণী ও জনসাধারণের মধ্যে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী চিন্তাধারা প্রতিষ্ঠার কাজ অগ্রসর হয়নি।
পরবর্তী যুগ পার্টির ভাষায় বামপন্থী বিচ্যুতির যুগ, একেবারে বিপরীত প্রতিক্রিয়ার যুগ। এ যুগের কমিউনিস্ট রাজনীতিতে যে মারাত্মক গোঁড়ামি ও সংকীর্ণতা ছিল, তা আজ সর্বজনবিদিত। বিপ্লবের স্তর, শ্ৰেণীমৈত্রী ও শ্ৰেণীজমায়েত, সব কিছুতেই ছিল বাম সংকীর্ণতা ও গোঁড়ামি। এই ভুলের জন্য পার্টিকে মাসুলও দিতে হয়েছে প্রচণ্ড পরিমাণে। কিন্তু অসংখ্য শ্রমিক, কৃষক ও পেটিবুর্জোয়া পার্টি কর্মী ও পার্টি দরদি যে বীরত্বের সঙ্গে অসম শ্রেণী সংগ্রামে প্রাণ দিয়েছেন, আমাদের বিপ্লবী অন্দোলনের ইতিহাসে তা এক অমূল্য সম্পদ। যেমন অমূল্য সম্পদ সেই শ্রেণীসংগ্রামগুলি তা সে যতই অপরিপক্ক ও বিপথচালিত হােক না কেন। বাংলাদেশের পার্টি সাহিত্যে তখন এর যে প্রতিফলন পড়েছিল তা সত্যিই গর্বের বস্তু। কল্লোলযুগের মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সে যুগে এক আশ্চর্য শিল্পীসত্ত্বায় দীপ্যমান হয়ে উঠেছিল। তাঁর “ছােটো বকুলপুরের যাত্রী”, “হারানের নাতজামাই”, “মেজাজ”, “রাঘব মালাকার’, প্রভৃতি গল্প বিষয়ে ও আঙ্গিকে হরিহর আত্মা হয়ে চিরদিনের মত চিরায়ত বিপ্লবী সাহিত্যের অঙ্গীভূত হয়ে রইবে। তখনকার গণনাট্য সংঘের সংগ্রামী গানগুলিতে আজও সংগ্রামী মানুষের রােমাঞ্চ জাগে। তখনকার দিনের পার্টি শিল্পীদের হাতে-আঁকা প্রাচীর চিত্রগুলির আশ্চর্য শিল্পরসােত্তীর্ণ বলিষ্ঠতা এখন অনেকেই নিশ্চয়ই ভুলে যান নি।
অতিবামপন্থী বিচ্যুতির যুগে কমিউনিস্ট পার্টি ছিল, সংগ্রামী শ্রমিক কৃষক পেটিবুর্জোয়া ছিল, ছিল শ্রেণীসংগ্রাম, ছিল বীরত্ব ও আত্মত্যাগ। অতএব শিল্পসাহিত্যে তার প্রতিফলন, কমিউনিস্ট আন্দোলনেরই বলিষ্ঠ বিপ্লবী ঐতিহ্য। অতিবামপন্থী বিচ্যুতির ও হঠকারিতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে যারা এই ঐতিহ্যকে মুছে দিতে চায়, তারা মতলববাজ, কারণ এই মওকায় আবার তারা শােধনবাদকেই প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। বাস্তব ক্ষেত্রেও ঠিক তাই দেখা গেল। অতিবামপন্থী বিচ্যুতি ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে শিল্পে-সাহিত্যে মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে বরবাদ করে বুর্জোয়া ভাবধারাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা আরম্ভ হয়ে গেল। কতকগুলি দুর্লক্ষণ অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠল। গোঁড়ামি ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে অবাধে ফ্রয়েডবাদকে প্রগতিবাদ বলে চালানাে হােল এবং মার্কসবাদের সঙ্গে ফ্রয়েডবাদকে প্রগতিবাদ বলে চালানাে হােল এবং মার্কসবাদের সঙ্গে ফ্রয়েডবাদকে পাঞ্চ করে মার্ক্সবাদসম্মত যৌনবিজ্ঞান বলে ‘সম্রান্ত’ অশ্লীল সাহিত্য চালু করা হােল। অভিযান আরম্ভ করা হােল অশ্লীল বলে সাহিত্য নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে কিন্তু রাজনৈতিক কারণে যে সব বই তখন নিষিদ্ধ, সেই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ ধ্বনিত হােল । পরবর্তীকালে অভিযান শুরু হােল অশ্লীল বলে ছবি নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে কিন্তু এস এস পােটেমকিনের’ মত যে সব ছবি রাজনৈতিক কারণে ভারত সরকার নিষিদ্ধ করে রেখেছেন তা নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য করলেন না। প্রথম রুশ বিপ্লবের পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার অন্ধকার যুগে ‘স্যানাইন' বলে একখানি যৌন উজ্জ্বলতা প্রচারকারী রুশ উপন্যাস তখন রুশ কর্তৃপক্ষ বিপ্লবীদের নৈতিক দৃঢ়তা ও মনােবল নষ্ট করার জন্য জেলে রাজবন্দীদের মধ্যে কৌশলে প্রচার করতেন, জানা যায়। হঠাৎ দেখা গেল, সেই বিরাট উপন্যাসখানির বাংলা তর্জমা বাজারে বেরিয়েছে। গান্ধীবাদী দর্শন ও সামন্তযুগীয় কৃচ্ছু সাধনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াইয়ের নামে বিপ্লবী কর্মীদের মধ্যে কৌশলে ব্যক্তিগত সুখসম্ভোগের বুর্জোয়া মনােভঙ্গী প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা হতে লাগল (যার চরম অভিব্যক্তি দেখা যায় ইদানিং কালের যুদ্ধবিষয়ক কতকগুলি সােভিয়েত চলচ্চিত্রে)। কমিউনিস্ট পরিচালিত পত্রিকায় প্রকাশ্যে কমিউনিস্ট বিরােধী রচনাদিও প্রকাশিত হতে লাগল, অথচ তার প্রতিবাদ প্রকাশিত হােল না। বুর্জোয়ার সঙ্গে ফ্রন্টগঠনের স্বার্থে পার্টি বিলােপের প্রবণতার জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া ভাবধারাকে প্রশ্রয়দান, মার্কসীয় রাজনীতিরভাষায় যাকে বলে ‘লিকুইডেশনিজম', যার বিরুদ্ধে ‘বলশেভিকিজমের ভিত্তিস্থাপনের জন্য লেনিন একদা সর্বশক্তি নিয়ােগ করে লড়েছিলেন তার লক্ষণ প্রকট হয়ে উঠল। তারপর, সােভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির বিংশতি কংগ্রেসের অনুকূল বাতাসে এই বিষাক্ত প্রবণতা ও মারাত্মক রাজনীতি যেন সমস্ত লজ্জাসরম ত্যাগ করে স্বৈরিণীর মত উদ্দাম হয়ে উঠল। আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক শিল্প সাহিত্যের দুনিয়ায় হঠাৎ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা শােধনবাদীদের কার্যকলাপে তারা দ্বিগুণ উৎসাহিত হয়ে উঠল। শিল্পসাহিত্য পার্টির ঊর্ধ্বে এবং পার্টি-লাইন, পার্টিশৃংখলা, পার্টি মনােভাব, পার্টি শিল্পসাহিত্যিকের জন্য নয়- এমন সব নির্বিচারে প্রচারিত হতে লাগল। প্রলেতারীয় শৃংখলাভঙ্গের একটা পেটি বুর্জোয়া অসুস্থ উল্লাস পার্টির শিল্পীসাহিত্যিকদেরই বিশেষভাবে আচ্ছন্ন করল। সহজেই এরা নিজেদের সাম্রাজ্যবাদীদের ও প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়াদের শিকার হতে দিলেন। গোঁড়ামির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে ‘শিল্পীর স্বাধীনতা’ ‘শিল্পীর স্বাধীনসত্ত্বা শিল্পীর বিশেষ সুবিধাভােগের অধিকার ইত্যাদি বুর্জোয়া শ্লোগান প্রলেতারীয় পার্টির মধ্যে চালু করতে লাগলেন। অন্তরীক্ষ থেকে সাম্রাজ্যবাদ যে এদের কিভাবে ব্যবহার করছে, তার জীবন্ত ও জ্বলন্ত প্রমাণ পাওয়া গেল হাঙ্গেরীর প্রতিবিপ্লবী অভ্যুত্থানে এদের সক্রিয়, এমনকি বহুস্থানে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা গ্রহণে। শিল্পীর স্বাধীনতা’ (যা প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়াব্যক্তিস্বাত বাদের একটি মােলায়েম রকমফের মাত্র) রক্ষার নামে প্রলেতারীয়’ একনায়কত্বের বিরুদ্ধে তাদের বিদ্রোহকে সাম্রাজ্যবাদীরা সহজেই প্রতিবিপ্লবী সশস্ত্র অভ্যুত্থানে জড়িত করে দিতে সক্ষম হােল।
এর থেকে যে শিক্ষা নেওয়া উচিত ছিল এখানে সে শিক্ষা নেওয়া হােল না; বরং শােধনবাদীদের চাপে প্রলেতারীয় একনায়কত্বের কঠোরতাকে নিন্দা এবং তজ্জনিত’ (?) প্রকম্পনের প্রতি একটা সহানুভূতির ভাব প্রগতিশীল মহলে চালু করার চেষ্টা হল। কিন্তু দুনিয়ার জঙ্গি প্রগতিশীল মহল তখন হাঙ্গেরীর ঘটনায় বিশেষভাবে বিচলিত হয়ে পড়েছেন; তাই ১৯৫৭ সালে মস্কোতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকমিউনিস্ট সম্মেলনে শােধনবাদকে বিশ্বকমিউনিস্ট আন্দোলনের সম্মুখে প্রধান বিপদ বলে চিহ্নিত করা হােল। কিন্তু অতীয় কামান পার্টির সর্বোচ্চ নেতা ঘােষণা করলেন যে, ভারতে গোঁড়ামিই এখান ! এই শোধনবাদী দের, বিশেষ করে শিল্পসাহিত্যক্ষেত্রের শোধনবাদীদের, পথ নিন করা হােল। বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদ, বুর্জোয়া মানবতা ও বুজোয়া অবক্ষয়ী চিন্তাধারায় বাংলাদেশের মার্কিনবাদীদের পরিচালিত পত্র-পত্রিকা ভরে যেতে লাগল। যুক্তফ্রন্টের নামে হরিহরত্রের মেলায় সাম্রাজ্যবাদী গুপ্তচরের বিচরণ খুবই সহজ ও স্বচ্ছন হয়ে উঠল। ১৯৬০ সালের দ্বিতীয় বিশ্বকমিউনিস্ট সম্মেলনের ঘোষণাবাণীতে শোধনবাদ' প্রধান বিপদ বলে পুনর্বার ঘোষিত হলেও শোধনবাদীদের সাবেতাজ রােধের শক্তি তখন পাটি হারিয়ে ফেলেছে। ভারতে শোধনবাদীদের দুঃসাহসী অগ্রপদক্ষেপ তখন উত্তঙ্গ শিখরে ওঠে, যখন চীন ভারত সীমান্ত বিরোধকে উপলক্ষ্য করে উগ্রতম জাতি বৈরী ও বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের লজ্জাহীন অভিব্যক্তিত্বে প্রকট হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের শোধনবাদী শিল্পী সাহিত্যিককে যে চেহারায় তখন দেখেছি, তাতে ভীত হলেও বিস্মিত হইনি। পার্টির অভ্যন্তরে এদের ক্রমবিকাশের ইতিহাস যাঁরা লক্ষ্য করেছেন, তাঁরা এই পরিণতির জন্য নিশ্চয়ই প্রস্তুত হয়েছিলেন। তখন মার্কসীয় কৌলিণ্যরক্ষার জন্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ঘোষিত “স্বাধীন সাহিত্য সমাজ থেকে স্বাতন্ত্র্যরক্ষার যে প্রয়াস তারা করেছিলেন, তা ছিল যেমন হাস্যকার তেমনই অর্থহীন। আসলে এরা তখন ‘মার্কিনবাদী’ হেঁসেল বাঁচিয়ে কিভাবে সাম্রাজ্যবাদকে নিয়ে ঘর করা যায় তাই নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিলেন। সাম্রাজ্যবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়ার পায়ে শোধনবাদীদের এই খোলাখুলি আত্মসমর্পণের অভিযানে বাংলাদেশের শিল্পী-সাহিত্যিকদের একটা অগ্রণী ভূমিকা বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। আমি একে একটা শুভ ও পরম বাঞ্চিত ঘটনা বলেই মনে করি। কারণ, এতে শোধনবাদীদের কার্যকলাপ সম্পর্কে প্রকৃত মার্কসবাদী লেনিনবাদীদের বিভ্রান্তি খড়গাঘাতে ছিন্ন হবারই মতই ছিন্ন হয়ে গেছে। আর মোহের কোন অবকাশ নেই।
আজ শোধনবাদী ডাঙ্গেপন্থী শিল্পীসাহিত্যিকেরা অত্যন্ত খােলাখুলিভাবেই শ্রেণী ও শ্রেণীসংগ্রাম বর্জন করছেন। আন্তর্জাতিক শোধনবাদের অনুগামী হয়ে তারা এখন শ্রেণীসংগ্রামের পরিবর্তে বুর্জোয়া মানবতাবাদকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন। লক্ষ্য করার বিষয়, শােধনবাদীদের খসড়া কর্মসূচীর শিল্প সংস্কৃতি অংশে শ্রেণী ও শ্রেণীসংগ্রাম কথা দুটি সযত্নে পরিহার করা হয়েছে। প্রকৃত মার্কসবাদী-লেনিনবাদীরা যখন সাহসভরে প্রতিরােধের সংকল্প নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন তখন সাম্রাজ্যবাদের গােপন অনুচর (শাধনবাদীরা বেপরােয়া হয়ে নগ্ন নির্লজ্জতায় আত্মপ্রকাশ করেছে। সাপ যতক্ষণ বিবরে থাকে ততক্ষণ তাকে মারা কঠিন, কিন্তু সে যখন বাধ্য হয়ে বিবর থেকে বেরিয়ে আসে তখন ভীত না হয়ে উল্লসিত হওয়া উচিত, কারণ তাকে তখন মারা সহজ হয়।
আজ আমাদের দেশের বিশেষত বাংলাদেশের শিল্পী-সাহিত্যিকদের কর্তব্য একদিকে যেমন শ্রেণীসংগ্রামের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ স্থাপন করা অন্যদিকে তেমনই শোধনবাদের বিরুদ্ধে নিরলস সংগ্রাম চালিয়ে প্রকৃত মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে শিল্প-সাহিত্য ক্ষেত্রে এবং জন-জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়ক হওয়া। সাধারণ-শত্রুর বিরুদ্ধে বিপ্লবী গণ-সংগ্রামের জন্য ফ্রন্ট গঠন তাকে করতেই হবে, কিন্তু আত্মবিলােপের লিকুইডিশনিস্ট পথে নয়, আত্মপ্রতিষ্ঠার অবিচল দৃঢ়তার পথে। নমনীয়তার এখানে নিশ্চয়ই একান্ত প্রয়ােজন কিন্তু সে নমনীয়তা যেন কোনক্রমেই আত্মসমর্পনের পর্যায়ে না যায়। সহনশীলতার পরাকাষ্ঠা দেখাতে হবে কিন্তু নিজের অস্তিত্ব, দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনৈতিক আত্মপ্রতিষ্ঠার অধিকারকে এতটুকু ক্ষুন্ন না করে। দড়ি যত খুশী বাড়ানো চলবে, কিন্তু খুঁটিটি তুললে চলবে না। বাংলাদেশে শিল্পসাহিত্য ক্ষেত্রে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী কর্মীদের সম্মুখে আজ বৈপ্লবিক গুরুদায়িত্ব বিদ্যমান। এ দায়িত্ব পালনে তারা সম্পূর্ণ সক্ষম হবেন, এ বিশ্বাস আমার আছে।*


Comments