top of page

চেনা মিথ্যা, চেনা দুখ, চেনা চেনা সূচিমুখ : স্তালিন, স্তানিস্লাভস্কি, মায়ারহোল্ড (ও কৌশিক সেন)

  • Writer: শুদ্ধব্রত দেব
    শুদ্ধব্রত দেব
  • Sep 29, 2021
  • 6 min read

গত ২৬ জুন নাট্যকর্মী কৌশিক সেন আনন্দবাজার পত্রিকায় একটি উত্তর সম্পাদকীয় লিখেছেন, "কোনও রাজনৈতিক দলই শেষ পর্যন্ত শিল্পীদের পক্ষে থাকে না : কিন্তু, আমরা কোন দিকে" এই শিরোনামে। লেখক শিল্পী বুদ্ধিজীবীদের একটা অংশের জনপ্রিয় প্রবণতাই হচ্ছে সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে রাজনীতির মানুষজন কথা বলতে গেলেই তাঁরা রে রে করে ওঠেন, কিন্তু রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা খুব একটা না থাকলেও রাজনীতি নিয়ে আলটপকা মন্তব্য করে দেওয়াটাকে তাঁরা জন্মগত অধিকার বলে মনে করেন। শুধু মন্তব্য করলে তবু একটা কথা ছিল না হয়, এঁরা আবার তার সঙ্গে 'কী করিতে হইবে' নিদানও হেঁকে বসেন। তাঁদের এই নিদানের ভিত্তি কোন প্রায়োগিক জ্ঞান থেকে প্রসূত - সে প্রশ্ন আজকে উহ্য রাখলাম। ঐতিহাসিক বস্তুবাদ নিয়ে কৌশিকবাবুর জানাবোঝার গন্ডী নিতান্তই সীমিত - এটাকেও না হয় আমরা ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখলাম। কিন্তু এই আলোচনা করতে গিয়ে কৌশিকবাবু জোসেফ স্তালিনকে টেনে এনেছেন, এটাতে যে ততোটা নির্বিকার থাকতে পারছি না! তা মোটেই এই কারণে নয় যে স্তালিন দেবত্বে আসীন, তাকে ধরাছোঁয়া যাবে না। কারণটি হলো, স্তালিনকে টেনে আনা হয়েছে এ'দেশের শাসকের ফাসিস্ত চরিত্রের অনুষঙ্গে এবং যথারীতি তাঁর তুলনা করা হয়েছে হিটলারের সাথে। সুতরাং তা একেবারে কণ্বমুনির আশ্রমের হরিণশিশুটির মতো আলাভোলা ব্যাপার নয়।

মুশকিল হয়েছে, বলশেভিক সাহিত্য সংস্কৃতির ইতিহাস নিয়ে মন দিয়ে পড়াশোনার বদলে পল্লবগ্রাহীতার কারণে কৌশিকবাবু ছড়িয়েছেন প্রচুর, তারপর আর কাছিয়ে তুলতে পারেননি। ওই লেখায় উত্থাপিত প্রত্যেকটি ছেঁদো যুক্তির উত্তর মজুত রয়েছে ওঁর লেখার মধ্যেই। অবলীলায় তিনি মাক্সিম গোর্কি, স্তানিস্লাভস্কি বা মায়ারহোল্ডের নেম-ড্রপ করেছেন, কেন করেছেন তা তিনি নিজেই বোঝেননি! আসুন এক নজর দেখি।

পূর্বপক্ষ ।। কৌশিক সেন লিখছেন : "প্রখ্যাত নির্দেশক ও অভিনেতা কনস্তান্তিন সের্গেইভিচ স্তানিস্লাভস্কি (১৮৬৩-১৯৩৮), যিনি না থাকলে গােটা পৃথিবীর অভিনেতা-নির্দেশকরা জানতেই পারতেন না, কী ভাবে পরিকল্পিত ভাবে, সুশৃঙ্খল এবং আশ্চর্য কল্পনাশক্তির সমন্বয়ে তৈরি হতে পারে এক জন অভিনেতার শরীর ও মন। অভিনয়ের স্বাভাবিকতা, তার পর সেই স্বাভাবিকতাকে পার হয়ে আরও অসীম সম্ভাবনার মধ্যে এক দল অভিনেতার যাত্রা, যা আজও গােটা পৃথিবী জুড়ে নানা পরিবর্তন ও ভাঙচুরের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছে। সেই যাত্রা শুরুই হত স্তানিস্লাভস্কির নেতৃত্বে রাশিয়ায় ‘মস্কো আর্ট থিয়েটার তৈরি না হলে।

পরবর্তী কালে স্তানিস্লাভস্কির এক অবিস্মরণীয় ছাত্র মায়ারহােল্ড, তাঁর শিক্ষকের থেকে অর্জিত বিদ্যার উপর ভিত্তি করে, বা তাকে অতিক্রম করে তৈরি করেন এক ভিন্ন ধারার অভিনয় পদ্ধতি। তাঁর পদ্ধতি, সৃষ্টির গভীর প্রভাব পড়ে গােটা বিশ্বের নাট্যচর্চায়। ১৯৩০ সালের গােড়া থেকে জোসেফ স্তালিন এক অভূতপূর্ব পরিবেশ এবং পরিমণ্ডল তৈরি করলেন সােভিয়েট ইউনিয়নে। অচিরেই মায়ারহােল্ডের থিয়েটার নিয়ে যাবতীয় পরীক্ষাকে সন্দেহের চোখে দেখা শুরু হল এবং তাঁকে এবং তাঁর নাট্যচর্চাকে দাগিয়ে দেওয়া হল জনবিরােধী, সামাজিক বাস্তবতা বহির্ভূত এক আঙ্গিকসর্বস্ব কর্মকাণ্ড হিসেবে। সরকারি নির্দেশে বন্ধ হল তাঁর থিয়েটার এবং অবশেষে ২৩ জুন ১৯৩৯ সালে গ্রেফতার করা হল মায়ারহােল্ডকে। হিটলারের জার্মানি ছেড়ে ব্রেশট পালাতে পেরেছিলেন। বহু দেশ ঘুরে আমেরিকায় এসে উঠেছিলেন। সে দেশেও তৎকালীন সরকার তাঁকে আন-আমেরিকান অ্যাক্টিভিটিজ কমিটির তদন্তের মুখে ফেলে, তাঁকে কমিউনিস্ট হওয়ার অপরাধে চূড়ান্ত হেনস্থা করে। মায়ারহােন্ডের ভাগ্য শুধুমাত্র গ্রেফতারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর উপর স্তালিনের পুলিশবাহিনী অকথ্য অত্যাচার চালায় এবং অবশেষে তাঁকে গুলি করে মারা হয় ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৪০ সালে।"

উত্তরপক্ষ ।। আমাদের প্রথম প্রশ্ন এই লেখায় স্তানিস্লাভস্কির নাম উল্লেখের প্রাসঙ্গিকতা কী? কৌশিকবাবু লিখছেন তো মায়ারহোল্ডের উপর স্তালিনের অত্যাচার নিয়ে, আর সেটাও কোনও সাত অধ্যায়ের প্রবন্ধে নয়, পোস্ট এডিটে, সুতরাং একটা গোটা অনুচ্ছেদ এটার উপর খরচ করলেন কেন? কেন, তিনি জানেন না? জানলে চেপে গেলেন কেন? আমরা জানি। বলব? কান টানলে যেমন মাথাটি আসে, মায়ারহোল্ড এলেও স্তানিস্লাভস্কির নাম আসতে বাধ্য। কিন্তু কেন এই বাধ্যতা, তার পুরোটাই যে বলা দরকার ছিল! "পরবর্তী কালে স্তানিস্লাভস্কির এক অবিস্মরণীয় ছাত্র মায়ারহােল্ড, তাঁর শিক্ষকের থেকে অর্জিত বিদ্যার উপর ভিত্তি করে, বা তাকে অতিক্রম করে তৈরি করেন এক ভিন্ন ধারার অভিনয় পদ্ধতি" - এটা তো অর্ধসত্য মাত্র। মায়ারহোল্ড তাঁর অবিস্মরণীয় শিক্ষককে কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন, সওয়াল করেছিলেন যে স্তানিস্লাভস্কি একজন 'মিথ্যাচারী'..., সত্যের ভান করে তাঁর জীবন কেটেছে এবং ভান কখনোই শিল্প হতে পারে না। এখানেই শেষ ছিল না। মায়ারহোল্ড কোরিওগ্রাফার নিকোলাই ফোরেগারের সাথে মিলে যে 'অক্টোবর থিয়েটার ফ্রন্ট' খুলেছিলেন, তার কর্মসূচিতে স্পষ্ট ঘোষণা ছিল "সমস্ত ধরণের পুরানো নাটকের উচ্ছেদ চাই" - যার দ্বিধাহীন সূচিমুখ ছিল স্তানিস্লাভস্কির দিকে। কৌশিকবাবু বুঝি এটা জানতেন না? জানলে বলবার সৎসাহস দেখালেন না কেন? আর না জানলে অনধিকার চর্চার দুঃসাহস দেখালেন কেন?

কৌশিকবাবুর মতো ভাবের ঘরে চুরি না করে পূর্বাপর ঘটনাক্রমটি জানা খুবই জরুরি। রাশিয়ার অগ্রণী নাট্যপ্রতিভা কনস্তান্তিন স্তানিস্লাভস্কি নাট্যকার নির্দেশক ভ্লাদিমির নেমিরোভিচ-দানচেঙ্কোর সাথে মিলে ১৮৯৮-এ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মস্কো আর্ট থিয়েটার (আদত নাম যদিও ছিল 'মস্কো পাবলিক অ্যাক্সেসিবল থিয়েটার'), ১৯১৭-য় বলশেভিক বিপ্লবের পর লেনিনের নেতৃত্বে ও উৎসাহে নতুন সোভিয়েত রাষ্ট্র যার সম্পূর্ণ দায়ভার গ্রহণ করেছিল, নাট্যচর্চার ধারাটিকে অব্যাহত রাখতে। বিপ্লবের অব্যবহিত পরে শিশু সোভিয়েত রাষ্ট্রকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য লেনিন সহ পার্টি নেতৃত্ব যখন অর্থনৈতিক ও সামরিক দিকটিতে মনোনিবেশ করতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেই সুযোগে আলেকজান্দার বোগদানফের মতো পাক্কা লেনিনবিরোধী বুদ্ধিজীবীর নেতৃত্বে 'প্রোলেতকুলত' (প্রোলেতার্স্কায়া কুলতুরা) নামে এক অতিবাম সাংস্কৃতিক আন্দোলন সূচিত হয়, যার নেপথ্যে ছিল ত্রৎস্কির (এবং লুনাচারস্কির) প্রত্যক্ষ উৎসাহ। 'প্রোলেতকুলত' প্রাচীনের বিরুদ্ধে নতুন জীবনের আর শ্রমিকশ্রেণীর সংস্কৃতির জয়গানই গাইছিল - বহু প্রথিতযশা লেখক-শিল্পীই এই ভুল ধারণার প্রভাবে পড়েছিলেন। কিন্তু প্রতিবিপ্লব প্রায়শই অতিবিপ্লবের পোশাক গায়ে চড়িয়ে আসরে অবতীর্ণ হয়, 'প্রোলেতকুলত'-এর উদ্দেশ্যও ছিল শিশু সোভিয়েত রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ভিতটাকে নড়বড়ে করে দেওয়া, মনোজগতে এক নৈরাজ্য তৈরি করা। নাট্যশালায় এই ধারার প্রতিনিধি ছিলেন স্তানিস্লাভস্কির সেই "অবিস্মরণীয় ছাত্র মায়ারহােল্ড" (অনস্বীকার্য, মায়ারহােল্ড নিজে একজন বিরলপ্রতিভা নট ও নাট্যস্রষ্টা ছিলেন, এবং ছিলেন স্তানিস্লাভস্কির প্রিয়তম ছাত্রও)। এই 'প্রোলেতকুলত' শিবির তীব্র নিনাদে ঘোষণা করেছিল - তাঁরা পুশকিন, গোগোল, দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়কে নির্মূল করেই ফেলেছেন, এবার চেকভ-ইবসেন-হাউপ্টমানের সম্ভার নিয়ে স্তানিস্লাভস্কির উচ্ছেদের অপেক্ষা! এই পর্যায়ে ত্রৎস্কির, আজ্ঞে হ্যাঁ, ত্রৎস্কির সুপারিশে একদিকে মায়ারহোল্ড 'পিপলস আর্টিস্ট' সম্মানে ভূষিত হন, অন্যদিকে কুৎসিত এই আক্রমণে হতবিহ্বল, অপমানিত জীবন পাওনা হয় স্তানিস্লাভস্কির (এই অপমানের দিনকাল, কার্য কারণ গুলিয়ে দিয়ে দিব্যি প্রচার করা হয় স্তালিনের জমানায় শ্বাসরোধ করা পরিবেশে ও নাট্যশালায় পার্টির হস্তক্ষেপে মানসিক অবসাদের শিকার হয়ে পড়েছিলেন স্তানিস্লাভস্কি)। এতটাই বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে গিয়েছিল 'প্রোলেতকুলত'দের এই ভূতের নৃত্য, যে স্বয়ং লেনিনকে এগিয়ে এসে এই 'অতিবিপ্লবীদের' বিরুদ্ধে কলম ধরতে হয়েছিল, বলতে হয়েছিল এই আস্ফালন শ্রমিকশ্রেণীর চিন্তার প্রতিনিধি নয়, বুর্জোয়া অবক্ষয়ের আরেকটা রূপ মাত্র। সেদিন লেনিনের উৎসাহে এবং পরবর্তীতে স্তালিনের উদ্যোগে কাতারে কাতারে শ্রমিকেরা ভিড় জমাতে শুরু করেন মস্কো আর্ট থিয়েটারে, উপচে পড়া ভিড় সামলাতে প্রায়ই নাটক নিয়ে যেতে হতো সোলোদোভনিকভের বিশাল প্রেক্ষাগৃহে। অন্যদিকে প্রায় ফাঁকা প্রেক্ষাগৃহে মায়ারহোল্ড, ফোরেগারদের দুর্বোধ্য নাটকগুলিকে 'অতিবিপ্লবী' পাতি বুর্জোয়া ইন্টেলেকচুয়ালদের হাততালি কুড়িয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছিল। এইভাবেই কমিউনিস্ট পার্টি শ্রমিক শ্রেণীর সঙ্গে আর্ট থিয়েটারের যোগ ঘটিয়ে স্তানিস্লাভস্কিকে বিকশিত হতে দিয়েছিলেন, অন্যদিকে মতাদর্শগত সমালোচনার মধ্য দিয়ে নৈরাজ্যবাদী বিশৃঙ্খলার মোকাবিলা করেছিলেন।

এবার মায়ারহোল্ডের পরিণতি প্রসঙ্গে আসি। মায়ারহোল্ডের গ্রেফতারি ও মৃত্যুদণ্ডের কারন কী হতে পারে? "অচিরেই মায়ারহােল্ডের থিয়েটার নিয়ে যাবতীয় পরীক্ষাকে সন্দেহের চোখে দেখা শুরু হল...", কৌশিকবাবু বলছেন। সন্দেহের চোখে কেন, সরাসরিই তো 'প্রোলেতকুলত'-বাহিনীকে বুর্জোয়া অবক্ষয়ী সংস্কৃতির ধারক বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল, কিন্তু তারপরেও তো তাঁরা সদম্ভে তাঁদের আস্ফালন চালিয়ে গিয়েছিলেন বেশ কয়েক বছর ধরে! মায়ারহোল্ড কৃতী শিল্পী ও নাট্যস্রষ্টা ছিলেন, নিজের যোগ্যতাতেই তিনি নাটক নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর প্রতি লেনিন ও স্তালিনের সমালোচনা ছিল বরাবর, কিন্তু কাজের স্বাধীনতা খর্ব করা হয়নি তাঁর। বরং স্তালিনের সময়েই তাঁর নিজের তৈরি থিয়েটার 'স্টেট্ মায়ারহোল্ড থিয়েটার'-এর রূপ পায়, যেখানে তিনি স্বাধীনভাবে তাঁর অভিনয়ে বায়োমেকানিক্স-এর তত্ত্ব প্রয়োগ ও চর্চা করে গেছেন। হ্যাঁ, অত্যুৎসাহী পার্টিজান শিল্পীদের একটি ব্লকের সুপারিশ ছিল, স্তানিস্লাভস্কিকে সরিয়ে মস্কো আর্ট থিয়েটারের নির্দেশক করা হোক মায়ারহোল্ডকে, স্তালিন তা দৃঢ়তার সাথে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। স্তালিন মনে করতেন শিল্পসাহিত্য "বিষয়বস্তুতে হবে আন্তর্জাতিক, কিন্তু আঙ্গিকে দেশজ", এবং তাই স্তানিস্লাভস্কির থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন সোভিয়েত রাষ্ট্রের তখনো ফুরোয়নি। কিন্তু মায়ারহোল্ডের পরীক্ষামূলক নাট্যচর্চা বা তাঁর ফিল্মে অভিনয় - কোনোটাতেই তো কোনও বাধা ছিল না। কী এমন হলো ১৯৩৯-এ ('প্রোলেতকুলত'-এর উন্মাদনাও যখন থিতিয়ে এসেছে) যাতে মায়ারহোল্ডকে গ্রেফতার হতে আর পরের বছর মৃত্যুদন্ড পেতে হলো? বায়োমেকানিক্স তত্ত্বের জন্য স্তালিন তাঁকে মেরে ফেলেছিলেন বললে তো ঘুড়ায়ও হাসব, তাহলে হাতে রইল পেন্সিল স্তালিনের হ্যাঁ-এ হ্যাঁ না মেলানোর অপরাধ, কিংবা পার্টির বেঁধে দেওয়া লাইনে নাটক না করার ধৃষ্টতা। কিন্তু সে যুক্তিতে তো মায়ারহোল্ডের বদলে স্তানিস্লাভস্কিকেই স্তালিনের গ্রেফতার করবার কথা, মানে কৌশিকবাবুর যুক্তি মানলে।

আর এত কথারই বা দরকার কী, মাক্সিম গোর্কিই সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হতে পারেন,যাঁর উদ্ধৃতি দিয়ে আবেগে থরো থরো হয়ে লেখাটা কৌশিকবাবু শুরু করেছিলেন। যে গোর্কি লেনিন এবং স্তালিনের আদ্যশ্রাদ্ধ না করে জল খেতেন না এক সময়ে, এবং প্রথমদিকে ওই 'প্রোলেতকুলত'-দেরই সঙ্গে মিলে নতুন এক 'ভগবানের নির্মাণ'-এর তত্ত্ব দিতেন, স্তালিন সেই গোর্কিকেই দীর্ঘ চেষ্টার পর সোভিয়েত দেশে ফেরত আনেন, এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্মানিত করে তাঁর নিশ্চিন্ত সাহিত্যচর্চার পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছিলেন। গোর্কিকে কি সেই 'অর্ডার অফ লেনিন' গলায় পড়বার জন্য ঘাড় নুইয়ে দিতে হয়েছিল? ইতিহাস কী বলে? জীবনের শেষদিন অবধি বহু প্রশ্নে স্তালিনের প্রতি সমালোচনামুখর ছিলেন গোর্কি, এমনকি মৃত্যুর দু'বছর আগে দেওয়া প্রথম সোভিয়েত লেখক কংগ্রেসে সভাপতির অভিভাষণেও সে দ্বিমতের প্রতিফলন আছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কমিউনিস্ট পার্টি পারত না সেই ভাষণকে সেন্সর করতে? করেনি তো! বরং গোর্কির মৃত্যুর পর পৃথিবী দেখেছিল এক মহান সাহিত্যিকের কফিন বইছেন জোসেফ স্তালিন নিজে! স্তানিস্লাভস্কি বা গোর্কি যে সম্মান পেয়েছিলেন, মায়ারহোল্ড তা থেকে বঞ্চিত হলেন কেন? কারণ স্তানিস্লাভস্কি বা গোর্কি পার্টি লাইনের ধরাবাঁধার মধ্যে সৃজনকাজ করতে চান নি, সোভিয়েত রাষ্ট্রের, পার্টির বা স্তালিনের সমালোচনা করেছেন একাধিকবার - গোর্কি তো মায়ারহোল্ডের থেকে অনেক কড়া ভাষাতেই করেছেন কখনও - সমস্তটাই ঠিক; কিন্তু তাঁরা কোনোদিন সোভিয়েত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চক্রান্তের অংশী হননি। দুঃখজনক হলেও, মায়ারহোল্ড হয়েছিলেন। তাঁর শাস্তি তাই একজন শিল্পীর নয়, এক প্ৰতিবিপ্লবীর শাস্তি ছিল। এখন যেহেতু মায়ারহোল্ড একজন প্রতিভাশালী শিল্পী, তাই এটা মেনে নিতে কৌশিকবাবুর অসুবিধা হচ্ছে। এতটা হতো না যদি মায়ারহোল্ড একজন প্রতিভাবান ইঞ্জিনিয়র বা কুশলী সমরবিদ হতেন। কিন্তু শ্রমিকশ্রেণীর একমাত্র রাষ্ট্রকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বটা স্তালিনের কাছে থিয়েটারের মহলাকক্ষের পোশাক মহড়া ছিল না, তাঁর ঐতিহাসিক বাধ্যতা ছিল। তাই নিজের দেশের একজন প্রতিভাধর শিল্পীকে হারানোর যন্ত্রণা বুকে চাপা দিয়েও এই বাধ্যতার কাছে অনুগত থেকে স্তালিন তাঁর কমিউনিস্টসুলভ দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছিলেন। আর অকমিউনিস্ট স্তানিস্লাভস্কিকে তাঁর নিজের মতো করে কাজ করবার পরিসরটুকু নিশ্চিত করে স্তালিন পরিচয় দিয়েছিলেন তাঁর হৃদয়ের প্রসারতার, দূরদৃষ্টির।

বিশ্বপুঁজিবাদী শিবির বহু অর্থ ও বহু বছর নিয়োজিত করে স্তালিনের ভাবমূর্তিকে হিটলারের সাথে মিলিয়ে মিশিয়ে এমন এক প্রতিমাকল্প আমাদের মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দিতে চেষ্টা করেছে, যাতে 'ডিক্টেটর' শব্দটি ভাবলেই এই দুটি ছবি আমাদের মনে একাকার হয়ে আসে। সেই ছবিই কৌশিক সেনেরা, জ্ঞানে বা অজ্ঞানে, মনোজগতে বহন আর বহির্জগতে বমন করে চলেছেন। আলোচনা হোক স্তালিনকে নিয়ে, সমালোচনাও হোক। আমরাও তাতে অংশ নেব সহিষ্ণুতার সাথেই। কিন্তু স্তালিনকে হিটলার বা নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে জুড়ে দিয়ে এইধরণের আলটপকা ফাজলামিতে এবার দাঁড়ি পড়ুক। অজ্ঞতা সর্বদাই স্বর্গীয় নয় কিন্তু!

Comments


bottom of page