শ্রেণী, পক্ষ ও দায় : সরোজ দত্তের কবিতা
- অভিজিৎ সেনগুপ্ত

- Sep 19, 2021
- 8 min read
Updated: Sep 30, 2021
একাত্তরের সালে ৫ আগস্ট ভোরবেলার ময়দানে যাঁর মাথা কেটে নিয়েছিল পুলিশ, যাঁর বুকে বিধে দেওয়া হয়েছিল রাষ্ট্রীয় বুলেট, তাঁর পরিচয় কি ছিল তখন? কবি? সাংবাদিক? বুদ্ধিজীবী? যাঁর মুণ্ডহীন শরীর পড়ে ছিল অর্ধশতক আগের ময়দানে, তিনি কি কবি? যিনি দু’দশক আগেই তাঁর কবিতাকে স্বেচ্ছায় নির্বাসন দিয়ে এই মহাপৃথিবীর জন্য একটা ‘অমল কবিতা’ রচনা করতে চেয়েছিলেন? শত্রু যার প্রশংসা করে, আমরা তার বিরোধিতা করি, তাই শত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হওয়া গৌরবের - এমন অনুভবকে যিনি সযত্নে তাঁর বুকের ভেতর লালন করে লিখতে চেয়েছিলেন মুক্তির মহাকাব্য?
নিয়ত উদযাপিত হন ‘কবি-সাংবাদিক সরোজ দত্ত’। 'কবি'র আগে 'বিপ্লবী' কথাটা বড়োজোর মাঝে মধ্যে ব্যবহার করা হয়। বাস্তবে সরোজ দত্ত কবি ছিলেন একদা। লিখতেন সরোজ কুমার দত্ত নামে। তাঁর কবিতা লেখার সময়কালটা চল্লিশের দশকের প্রারম্ভিক সময় বলা যেতে পারে। সরোজ কুমার দত্ত বিপ্লবী জনতার কাছে এবং শ্রেণীশত্রুদের কাছে যতদিনে সরোজ দত্ত হয়ে উঠবেন, কবিতাকেও ততটাই পিছে ফেলে ‘অসি মসীকে’ এক করবার প্রাণান্তকর চেষ্টায় ব্রতী হয়ে পড়বেন ততদিনে। সরোজ দত্ত নামটাই হয়ে উঠবে সত্তর দশকের অগ্নিস্রাবী সময়ের অন্যতম রচনাকার। সরোজ কুমার দত্ত যখন কবি, আর যখন তিনি পেশাদার কমিউনিষ্ট বিপ্লবী নেতা, এই দুই স্বত্বার মধ্যে অদৌ কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। ছিল শুধু দুটো দশকের ব্যাবধান। কিন্তু এই দুটো দশকেই বদলে গিয়েছিলো এদেশের কমিউনিষ্ট আন্দোলনের মতাদর্শগত অবস্থান। স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিলো সুবিধাবাদ আর বিপ্লবী ধারার মধ্যকার বিভাজন রেখাটি। সরোজ দত্ত সেই বিভাজন ঘটিয়েছিলেন তাঁর কবিতায়, প্রায় দুদশক আগেই। আমাদের আলোচ্য বিষয় হলো এটাই।
পাঁচের দশকে লেখা তাঁর কবিতার লাইনের সাথে পরবর্তী তাঁর জীবনচর্যা সঙ্গতি রেখেই যেন এগিয়েছে। আর এখানেই অনন্যতা বজায় রেখেছেন তিনি। গণজীবনের হাটের মাঝখানে নিজেকে টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি তৎপর ছিলেন। চল্লিশের কবিতা ধারার সাথে যাঁরা পরিচিত তাঁরা সবাই জানেন যে রবীন্দ্র-পরবর্তী লেখকদের রবীন্দ্র প্রভাব মুক্ত হওয়ার একটা প্রাণপণ চেষ্টা ছিল। সরোজ দত্ত সেখানেও ব্যতিক্রমী ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের প্রতি আস্থাশীল সরোজ দত্ত কবিতার পুরোনো আঙ্গিককেই কাজে লাগিয়ে চমকপ্রদ রাজনৈতিক ভাষ্য নির্মাণের দক্ষতা দেখিয়েছিলেন।
মাটি ও মানুষের সাথে সম্পর্ক রহিত, আত্মমুখীন, রোম্যান্টিক ভাবালুতায় আপ্লুত এবং নিভৃত কবিতাচর্চার অনুসারী লেখকদের সাথে গণরাজনৈতিক, জীবনাশ্রয়ী শিল্পের প্রতি আকর্ষিত কবিদের মেরুকরণ একটা সময় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সরোজ দত্ত ১৯৫৫ সালে প্রগতিশীল আধুনিক কবিতা সম্পর্কে লেখেন –“মোটামুটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাল থেকে শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী মতাদর্শ ও রাজনীতির ছায়া বাংলা কাব্যে পড়তে শুরু করে। তরুণ কবিরা নানা ভুলভ্রান্তি নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হ’তে থাকেন। নতুনত্বের প্রয়াসে তাঁদের রচনা কখনো দুর্বোধ্য কখনো-বা অতিসরল ও কাব্যহীন হ’তে থাকে।” কবিতা সম্পর্কে সরোজ দত্ত 'দুর্বোধ্য' অথবা 'অতিসরল কাব্যহীন' এই দুই বিপরীতধর্মী প্রবণতারই বিরোধী ছিলেন। কাব্যের প্রথম এবং প্রধান উপজীব্য হিসেবে তিনি আবেগকেই প্রাধান্য দিতে চেয়েছিলেন। তাঁর প্রিয় কবি ছিলেন বিমলচন্দ্র ঘোষ। ১৯৬০ সালের জানুয়ারী, ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায় কবি বিমলচন্দ্র ঘোষ সম্পর্কে লিখেছিলেন – “বিমলচন্দ্র হাটের কবি… নির্জনতা ত্যাগ করে তিনি হাটের মাঝখানে এসেছেন …” । এই মননের জগতেই বাস করতেন কবি সরোজ দত্ত, যিনি অনায়াস দক্ষতায় লিখতে পারেন –
আমার কবিতা কভু কহিবেনা আমার কাহিনী,
অসতর্ক কোন ছত্রে ধ্বনিবে না ক্রন্দন আমার,
আমার কবিতা নহে দুর্বলের দুঃখের বেসাতি,
নহে সে অপূর্ণকাম অক্ষমের মর্মব্যভিচার।
এ নহে সমষ্টিপ্রেম স্বার্থপর স্বতন্ত্রবাদীর,
আনিনি শক্তির পায়ে অশক্তের শঙ্কিত প্রণামী,
গণ গগনের পথে অগ্নিরথ জনমানবের
যাহারা টানিয়া আনে, তাহাদের সহকর্মী আমি।
আমার পাবে না দেখা আমার কাব্যের পৃষ্ঠপটে,
সেথায় আমার সীমা অসংখ্যের অসীমে বিলীন,
বিষপঙ্কে তন্দ্রাহত রুদ্ধস্রোত শৈবাল দীঘিরে,
বাহিরের বন্যাজলে করিয়াছি দিকচিহ্নহীন।
কবরে প্রেতিনী হয়ে কাঁদিবেনা আমার বেদনা,
দুঃসাহসী বিন্দু আমি, বুকে বহি সিন্ধুর চেতনা।
১৯৩৯ সালে লিখিত এই কবিতার শিরোনাম ছিল ‘কোনো বিপ্লবী কবির মর্মকথা’। এই কবিতা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক বিনয় ঘোষ লিখেছিলেন – “ভবিষ্যতে মানুষের মহাতীর্থ গঠনে স্বপ্নে মশগুল তরুণ কবি সরোজ কুমার দত্ত।… শব্দগুলি তাঁর যেমন কাঠিন্যে উজ্জ্বল, তেমনি নিবিড় আবেগে কম্পমান… দুঃসাহসী বিন্দু হয়ে যিনি সিন্ধুর চেতনা বহেন, প্রেতিনী হয়ে যাঁর বেদনা কোনোদিন আমাদের কান্না শোনাবে না, তাঁর যে বিশ্বাস টলটলায়মান নয় তা নিয়ে তর্ক করা চলে না।”
বন্ধুবর কবি অরুণ মিত্র লিখেছেন – “তাঁর রচনাই আমাদের জানিয়ে দেয় যে, তাঁর মননে এবং সৃজনে কোনো শৈথিল্যের প্রশয় নেই।” তা যে সত্যিই ছিল না, কবিতা অনুশীলনের বাইরেও তাঁর জীবনধারা যেভাবে প্রবাহিত হয়েছে তা এই সত্যকেই প্রতিষ্ঠা দেয়।
কিন্তু এসবই তো আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে তাঁর কবিতা ঘিরে। তাঁকে ঘিরেও। অথচ সরোজ দত্তের কবিতা নিয়ে যে বিষয় প্রায় অনালোচিত থেকে গেলো – তাঁর কবিতার মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে ওঠা শ্রেণীবোধ। সাহিত্যের বৃহত্তর ক্ষেত্রভুমিতে সামাজিক সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেনীর প্রাধান্য থেকেছে বরাবর। এটা সামাজিক বাস্তবতাও। রাজনৈতিক পরিভাষায় পেটিবুর্জোয়া বলে চিহ্নিত লেখক সম্প্রদায়ের অনেকেই, যাঁরা মেহনতী মানুষের স্বপক্ষে তাঁদের কলমকে ব্যবহার করেছেন, তাঁদের অসাধারন লিখনশৈলীকে স্মরণে রেখেও বলা যায় তাঁদের কেউই নিজেকে শ্রেণীচ্যুত করতে প্রয়াসী ছিলেন না, বা এখনো হতে চাননা । মতাদর্শ হিসেবে বামপন্থাকে গ্রহন করার পরেও। আর এখানেই সরোজ দত্ত স্বতন্ত্রতায় উজ্জ্বল।
বৈশাখের মধ্যদিনে অগ্নিদাহে মূর্ছাতুর আমি,
চাহি জল, চাহি ছায়া, চাহি বৃষ্টিধারা,
সকলি আনিবে যবে মহামেঘ কালবৈশাখীর,
পাতার কুটিরে আমি উৎকন্ঠায় হব দিশাহারা।
(মধ্যবিত্তের বিপ্লব-বিলাস)
দোদ্যুল্যমান মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে এই কবিতা বাংলা সাহিত্যে বিরল। নিরাপদ দূরত্বে থাকা মধ্যবিত্তের বিপ্লব ভীরুতার বাস্তবতাকে চার লাইনের কবিতায় তুলে ধরার প্রশ্নাতীত দক্ষতা বোধহয় সরোজ দত্তের পক্ষেই সম্ভব। বিপ্লব বিলাসী বাবুদের মধ্যপন্থী এই চিত্র, সুবিধাবাদী বাম নেতৃত্বের প্রতি তীব্র কটাক্ষ হয়ে যেন ফিরে আসে। নকশালবাড়ি ঘটনার প্রায় তিরিশ বছর আগে লিখিত এই কবিতা । ১৯৩৯ সালে।
ভারতীয় রাষ্ট্র ,তার সংস্কৃতির মধ্যে থাকা সামন্ত মুল্যবোধ, এবং শ্রেনীবৈষম্যকে স্পষ্টতার সাথে কবিতায় নিয়ে আসার কৃতিত্ব কবি সরোজ দত্তেরই সর্বপ্রথম। পুরানের প্রচলিত ভাষ্যকে সরোজ দত্ত পরিবর্তিত করেছিলেন নিজের শ্রেনীগত দৃষ্টিভংগীর নিরিখে। চমকপ্রদ ব্যঞ্জনায় এদেশের বর্নব্যবস্থার আদিম রুপ, সেই সাথে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বয়ানে উজ্জ্বল আর ধারালো হয়ে ওঠে তার কবিতা। 'উত্তরকাণ্ড' কবিতায় সরোজ দত্ত লিখলেন -
রাঘবের রাজ-সভা জমে ওঠে, শুধু মাঝে মাঝে
গলিত মাংসের গন্ধে মরে যায় চন্দন সুবাস
যমুনার শীর্ণ স্রোতে কোথা হতে এসেছে ভাসিয়া
রাজার স্নানের ঘাটে ছিন্নশির চণ্ডালের লাশ।
অন্ধকার গৃহকোণে দন্তহীন স্থলিত চোয়ালে
স্মৃতির জাবর কাটে জরায় স্থবির মহাবীর
চকিতে স্ফটিক স্তম্ভে ছায়া ফেলে দ্রুত সরে যায়
প্রতিহিংসা-তৃষাতুর ছায়ামূর্তি প্রেতাত্মা বালির!
অজেয় শত্রুর চিত সিন্ধু কূলে দাউ দাউ জ্বলে
বানরের রক্ত মূল্যে প্রতিষ্ঠিত নরের শাসন।
এখানে “রাজার স্নানের ঘাটে চন্ডালের লাশ” এভাবে উল্লেখিত হয়েছে বাক্যটি। রঘুকুলপতি রামের স্নানের ঘাটে ভেসে আসছে চন্ডালের লাশ। রাম যে দলিত শম্বুকের মাথা কেটে নিয়েছিলো, যেন সেই মুন্ডহীন দেহই ভেসে আসছে জলে।এই কবিতায় স্পষ্টতর করে তিনি লেখেন "…অজেয় শত্রুর চিতা সিন্ধুকূলে দাউ দাউ জ্বলে /বানরের রক্ত মূল্যে প্রতিষ্ঠিত নরের শাসন"। ভক্তিবাদ মিশ্রিত পুরানের আখ্যানকে বদলে ভারতের দলিত ভাবনায় দেখবার অন্যন্য উদাহরন তাঁর ছড়িয়ে রয়েছে সব পুরান নির্ভর কবিতাগুলোতে, এ'দেশে দলিত পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির বিকাশের অনেক আগেই। দুষ্মন্ত-শকুন্তলার পরিচিত পাঠের বিপ্রতীপে তিনি জনসাহিত্যের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিষ্ঠা দিচ্ছেন। 'শকুন্তলা' কবিতাটা এখানে পূর্ণাঙ্গ পাঠ দাবী করে।
দুর্বাসার অভিশাপ, অভিজ্ঞান অঙ্গুরী কাহিনী
স্বর্গ মিলনের দৃশ্য, মিথ্যাকথা হীন প্রবঞ্চনা—
রাজার লালসা-য়ূপে অসংখ্যের এক নারীমেধ
দৈবের চক্রান্ত বলি রাজকবি করেছে রটনা।
গৃহস্বামী দেশান্তরে, অরক্ষিত দরিদ্রের ঘরে
নারীমাংস লােভে রাজা মৃগমাংস এল পরিহরি—
অরুচি হয়েছে যার অবিশ্রাম নাগরীবিহারে
তাহার কথার ফাঁদে ধরা দিল অরণ্য-কিশােরী।
স্তব্ধ আজি নাট্যশালা, নান্দীমুখ আতঙ্কে নির্বাক
বিদীর্ণ কাব্যের মেঘ, সত্যসূর্য উঠেছে অম্বরে—
দর্শক শিহরি করে নাটিকার মর্মকথা পাঠ,
‘বালিকা গর্ভিণী হল লম্পটের কপট আদরে’
রাজার প্রসাদভােজী রাজকবি রচে নাট্যকলা,
অন্ধকার রঙ্গভূমি, ভূলুণ্ঠিতা কাদে শকুন্তলা।
রাজার লোভী অধিকারবোধ, প্রাসাদের প্রসাদভোজী রাজকবির মিথ্যে ভাষণ, আর প্রান্তিক নারীকে যৌনপ্রবঞ্চনার এমন যুগোত্তীর্ণ, অভিনব ভাষ্য নির্মান বাংলা কবিতায় এর আগে আসেনি এমনভাবে।আসেনি শকুন্তলার প্রচলিত কাহিনীর এমন নির্মাণ। শকুন্তলা দুষ্মন্তের প্রেম নিয়ে এর আগে বাংলা সাহিত্যে বহু আবেগপূর্ণ রচনা প্রকাশ পেয়েছে, রবীন্দ্রনাথের লেখাতেও তার উদযাপন রয়েছে, কিন্তু ‘বালিকা গর্ভিনী হলো লম্পটের কপট আদরে’ এই ভাষ্য প্রান্তিক নারীর সামাজিক অবস্থানের দিকে দৃষ্টিপাত করায়।
সরোজ দত্তের কবিতায় পরাভূত মানুষের চেহারা পেয়েছে প্রতিরোধের দৃঢ়তা, শ্রেণীশত্রু নিধনের ন্যায্যতা। ক্লান্ত, পরাজিত, বুভুক্ষু মানুষের প্রতিবাদে সামিল কবিরা পা মেলাতে চেয়েছিলেন ‘ভুখমিছিলে। '৫৯ সালে শপথ কবিতায় তিনি স্পষ্টতই লিখছেন –
রাজনীতি বুঝি না আমি,
বুঝি না তোমাদের সমাজবিপ্লবের এই জটিল তত্ত্ব কথা।
… …
তাই, তত্ত্বের আকাশে তর্কের শরজাল
রচনা করো তোমরা, আমাকে মুক্তি দাও।
সময় নেই আমার –
অভিমানিনী যাজ্ঞসেনীর বেণী বাঁধতে হবে আমাকে
দুঃশাসনের রক্তমাখা হাতে।
মধ্যবিত্ত সুলভ দোদুল্যমানতা, রাজানুগ্রহ, আপোষকামীতার বিরুদ্ধে তাঁর কবিতার উচ্চারণ ছিল নির্মেদ ও স্পষ্ট। বেশ কিছু কবিতার বিষয়বস্তু হিসেবে এই প্রেক্ষিত বেছে নেওয়াটাও সমসাময়িক কবিদের থেকে তাঁকে পৃথক করেছে। মধ্যপন্থী বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে উচ্চারিত তাঁর কবিতা এখনও ‘রাজার প্রসাদভোজী রাজকবিদের’ উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দেওয়া যায় অনায়াসেই। ১৯৩৯'র মে মাসে ‘অগ্রণী’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর কবিতার শিরোনাম ছিল 'বর্তমান বুদ্ধিজীবীর প্রতি'। সেখানে তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় লিখেছিলেন –“তোমার বুদ্ধির সুধা, সুরা হলো আঁধারে পচিয়া”। এই পঙ্ক্তিটি আজ উত্তরআধুনিক মতাদর্শের ফেরিওয়ালা বুদ্ধিজীবীদের প্রতিই যেন উচ্চারিত হয়েছে। ক্ষমতালিপ্সু, ধান্দাবাজ বুদ্ধিবৃত্তির বিরুদ্ধে উচ্চারিত এই পংক্তি সুতীব্র কষাঘাত করছে আজকের সময়ের প্রাসঙ্গিকতাতেও। কবিতাটির প্রারম্ভে তিনি অতীব তাৎপর্যময় ব্যবহার করলেন ড. ব্রজেন শীলের উদ্ধৃতির, "Mephistopheles, the emancipated intellect, is abroad." তারপরে পড়ে নিই মূল কবিতাটির পূর্ণপাঠ -
তােমার বুদ্ধির সুধা সুরা হল আঁধারে পচিয়া
সে অগ্নি-পানীয়ে নিত্য জ্বলে তব ঘৃণ্য পাকস্থলী
কৌমার্য করিতে রক্ষা আত্মরতি সম্বল তােমার,
তােমার দুর্বল কণ্ঠে স্বেচ্ছাবন্দী পাখীর কাকলি
প্রাণশক্তি প্রাণহীন, ধরিয়াছ প্রাণঘাতী নেশা;
চরণে কাঁদিছে কায়া, ছায়া ভাবি হাসাে উপহাসে -
করেছ গতির রক্তে পঙ্গুতার প্রশস্তি রচনা,
বিচ্ছেদ ভুলিতে চাহ বিরহের নির্বীর্য বিলাসে
প্রসবের ব্যর্থতায় অভিমানী সৌখীন শাখার
স্বার্থপর আত্মনাশ বনস্পতি করিবে না ক্ষমা,
তৃষ্ণায় শ্বসিছে তবু শিকড়ের শূন্যভাণ্ড হাতে,
সংবর এ ক্লীব কান্না, দেখনি কি মৃত্তিকা নির্মম
রাজদণ্ড বহি শিরে, শ্লথছন্দে রচিয়া বিলাপ
যে চাহে অলকা, তার নির্বাসন যােগ্য অভিশাপ।
সংঘর্ষের অনিবার্য রাস্তাতেই ছিল সরোজ দত্তের পূর্ণ আস্থা। ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিপ্লবী ধারার প্রতি অবিচল নিষ্ঠা আমৃত্যু থেকেছে সরোজ দত্তের। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের আপোষকামী সুবিধাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে মতাদর্শগত সংগ্রামের অগ্রনী সৈনিক ছিলেন তিনি। নকশালবাড়ি আন্দোলনের সময় যা সবচেয়ে বেশি শাণিত হয়েছিল। কিন্তু চল্লিশ-পঞ্চাশের দশক থেকেই তার বীজ কবি সরোজ দত্তের মধ্যে নিহিত ছিল। এ সত্য বোঝা যায় তাঁর কবিতার চলন দেখলেই। অসম্ভব রসবোধ, তীব্র বিশ্লেষনী ক্ষমতা, রাজনৈতিক স্যাটায়ার তাঁর কবিতায় বিশেষ মাত্রা যোগ করেছিল। সমকালীন কবিদের মধ্যে এও আরেকটি ব্যতিক্রম। রূপকের অনুসঙ্গে তিনি এদেশের চালু সুযোগসন্ধানী ধারাটিকে উন্মোচন করেছিলেন প্রখর রসবোধের মিশ্রনে । এই পরিসরে তার একটি দৃষ্টান্তই টানব।
আমি বাস করি খাস তালুকে -
হাসপাতালের লাশ কাটা ঘরে বেঁধে রাখি পােষা ভালুকে।
আমি কারাে পরােয়ানা পরােয়া করি না
ঘরােয়ানা ভাজি মেজাজে
আমি তখনি সে কাজ ভণ্ডুল করি
যখনি লাগাও যে কাজে।
আমি কালু বলে ডাকি ভুলুকে এবং
ভুলু বলে ডাকি কালুকে।
আমার যেদিনই ইচ্ছে সেদিনই
মেদিনীপুরের জঙ্গল থেকে ধরে এনে বুনাে ভালুকে,
আমি উপহার দেই লালুকে।
আমি সমতল করি ঢালুকে
আমি বানচাল করি চালুকে
আমি রাঙ্গা মাসীমার মাসিকে খাওয়াতে
টম্যাটো বানাই আলুকে।
নকশালবাড়ি আন্দোলনের তাত্ত্বিক রূপকার চারু মজুমদার বলতেন "রক্ত ঝরা পথই বিপ্লবের পথ"। বহু আত্মত্যাগের যে মহাকাব্য রচিত হয়েছিল তরাইয়ের প্রান্ত দেশে এবং তা ছড়িয়ে পড়েছিল সারা ভারতে, সেই ধারার সবচেয়ে উজ্জ্বল আবিষ্কার সরোজ দত্ত এই সংঘর্ষকেই মান্যতা দিয়েছিলেন তাঁর কবিতার বিভিন্ন আঙ্গিকে। বহু আগেই।‘অগ্রণী’পত্রিকায় ১৯৪০ সালে ‘ফিনল্যান্ড’ বলে একটি কবিতা লেখেন সরোজ দত্ত। এই কবিতাটির মুখবন্ধে তিনি লেখেন, “কবিতাটি রুশ-ফিনিশ সংঘর্ষের সময় লিখিত।… আমার মনে হয়, কবিতাটির তাৎপর্য ও উপযোগিতা যদি কিছু থাকে, তবে তাহা এখনও নিঃশেষিত হয় নাই। ভবিষ্যতে বহুকালের মধ্যে হইবেনা।” বাস্তবিকই আজকের সংবাদ মাধ্যমের ভূমিকার কথা মাথায় রাখলে এই কবিতার প্রাসঙ্গিকতা সহজেই অনুভব করা যায় -
সত্যের সুধার ভাণ্ড সংগোপনে রাখিয়া তাহারা
সংবাদপত্রের পাত্রে মিথ্যার মদিরা নিত্য ঢালে,
উৎকন্ঠিত পিপাসায় আমাদের কন্ঠাগত প্রাণ,
আমরা আকন্ঠ গিলি সে গরল প্রত্যহ সকালে।
সরোজ দত্ত শহিদ হওয়ার ৩৫ বছর আগে দক্ষিণ চীনের কিয়াংসীর গহন পার্বত্য অঞ্চলে গেরিলা বাহিনীর সাথে ছিলেন কবি চেন-ই। চারিদিক থেকে তাঁকে ঘিরে ফেলা হয়েছিল। শত্রু পরিবেষ্টিত চেন-ই নিজের অবধারিত মৃত্যুর কথা মনে করে একটি কবিতা লিখে যান। যে কবিতার বাংলা অনুবাদকের নাম সরোজ দত্ত। কবিতার শিরোনাম ‘মৃত্যুর মুখে দাঁড়ায়ে বলিব’। সরোজ দত্ত নিজেই একটা কবিতায় অনুরূপ ভাবেই লিখেছিলেন –“শুধু যেন একদিন গুদোমের গর্ভ অন্ধকারে/আদমসুমারী মোর শেষ হবে বেদম প্রহারে।” সরোজ দত্তের নিজের জীবনের সাথে সংযোগ লক্ষ্য করলে, চেন-ই র যে কবিতা তিনি অনুবাদ করেছিলেন, তার একটি লাইন বিশেষভাবে প্রণিধাণযোগ্য হয়ে ওঠে।
৫ আগস্ট, ১৯৭১। ভোরের ময়দানে সরোজ দত্তের শিরোচ্ছেদ করল রাষ্ট্রীয় ঘাতক বাহিনী। সে মৃত্যু একজন কবির মৃত্যু? নাকি এদেশের চলমান বিপ্লবী আন্দোলনের অগ্রণী যোদ্ধা, নেতার শহীদের মৃত্যু বরণ? 'মৃত্যুর মুখে দাঁড়ায়ে' একবারও কলমজীবী থেকে বিপ্লবজীবী হয়ে ওঠার জন্য অনুশোচনা হয়েছিল তাঁর? চেন-ই র কবিতার অনুবাদেই সরোজ দত্ত উত্তর লিখে গিয়েছিলেন।
বিশ বছর কেটেছে অন্যায়ের সাথে পাঞ্জা কষে,
সারা জীবন ছায়ার মতাে বিপদ ফিরেছে পিছু পিছু -
আজ লগ্ন এলাে যাবার, তাই কণ্ঠে নিলাম গান,
অস্ত সূর্যের রাঙা আলােয় চীৎকার করুক কাকের দল,
কী আসে যায়।
বিপ্লব বড় নির্মম, শত সংগ্রামের আহুতি চায় সে;
আজ করুক ওরা আমার শিরচ্ছেদ, কি আসে যায়।
পাতালের প্রেতলােকে জমায়েত করবাে যত পুরাতন সহযােদ্ধাদের
তারপর ঝাপিয়ে পড়ে শেষ করবাে জাহান্নামের অধিরাজকে।
বিশবছর ধরে আশার মশাল জ্বলছে দক্ষিণে,
আমার ছিন্ন শির যদি আজ দূর্গপ্রাকারে ঝােলে, ঝুলুক।
তােমরা যারা রইলে এগিয়ে যেও দ্বিগুণ উদ্যমে,
তােমাদের জয়ের সংবাদ খুশীর জোয়ার আনবে—তাদের বুকে,
যারা আর রইল না।
বিশ বছর ধরে বিপ্লবই আমার গৃহ;
চিরকালই আকাশে রইল রক্তবৃষ্টির জমাট মেঘ;
তবু জানি এ অমানিশার অবসান আসন্ন।
প্রাণের কুসুম ছিন্ন করে আমরা অর্ঘ্য দিলাম-ন্যায়ের যুদ্ধে,
জানি, একদিন মুক্তির রক্তকমল সহস্র দল মেলে দেবে
সারা দুনিয়ায়।


Comments