একজন পূর্ণ মানুষ, কিছু টুকরো কথায়/১
- প্রতিরোধের ভাষা

- Sep 25, 2021
- 11 min read
যাঁরা ব্যক্তিগতভাবে সরোজ দত্তের সংস্পর্শে এসেছেন
বেলা দত্ত
নারীদের সম্পর্কে অপরিসীম শ্রদ্ধা ছিলো সরোজ দত্তের। তিনি বলতেন পুরুষপ্রধান শােষণের জোয়াল নারীদের ঘাড়ে চাপানাে আছে। তিনি মনেপ্রাণে চাইতেন শােষণের জোয়ালের হাত থেকে মুক্ত হয়ে নারীরা সম্পূর্ণ আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা করুক। তাঁর কথায় এবং কাজে কখনাে ফাঁক থাকতাে না। তিনি কোনােদিন চাইতেন না আমি পদানত হয়ে থাকি। তাঁরই চেষ্টায় ও প্রবল উৎসাহে আমি গ্রামে যেতে পেরেছিলাম রাজনৈতিক কাজের জন্য। বঙ্কিমচন্দ্রের দেবী চৌধুরাণী সম্পর্কে বলতেন, এমন একটা নারী চরিত্রকে সংসারে ফেরৎ পাঠানাের কোনাে সার্থকতা নেই, বরং আছে স্বার্থপরতা।
সরোজ দত্ত উদারচেতা কর্তব্যনিষ্ঠ, মানুষ হিসেবে খুব দরদী ছিলেন। আমাকে সব কাজে সাহায্য করতেন। সব কাজ পারতেন না, অনভ্যস্ত ছিলেন। বলতেন, 'দেখাে দেখাে, দু’চারদিন করলেই সব শিখে যাবাে। তােমার কোনাে চিন্তা নেই'। উনুন ধরানাে, স্টোভে চায়ের জল চাপানো, ভাত খেয়ে থালা থােয়া—এসব কাজকে ছােটো ভাবতেন না। আমার কোনাে কাজে বাধা দিতেন না, আমার মতামতকে অগ্রাহ্য করতেন না। আমার ভুল হলে কিছুমাত্র ক্ষুন্ন না করে তা বুঝিয়ে দিতেন। সবসময় ছেলেদের বলতেন — 'মাকে সাহায্য করবে। ভাত খেয়ে নিজের থালা সবসময় ধুয়ে রাখবে, নিজের এঁটো অন্যকে কুড়ােতে দেবে না'। যখন মাও-সে-তুঙের লেখা বেরােল প্রত্যেক বিপ্লবীর কিছু না কিছু দৈহিক পরিশ্রম করা উচিত এবং সংসারের কিছু কাজ করা উচিত তখন তিনি আরও পরিশ্রম করা শুরু করে দিলেন। কাপড় কাচতে ঠিক পারতেন না, উনুনে কাগজ দিয়ে ধরিয়ে দিতে পারতেন, কিন্তু উনুন সাজাতে পারতেন না। এইসব যেগুলাে পারতেন না সেগুলো ধীরে ধীরে শিখে করতে শুরু করলেন।
বিয়ের পর ছােট্ট টিনের সুটকেস সঙ্গে দিয়ে আমাকে হাওড়া ময়দান স্টেশনের ট্রেনে বসিয়ে দিয়ে এলেন সরােজ দত্ত। আমি গিয়ে তেভাগা আন্দোলনের যে লােক্যাল কমিটি ছিলো তার সঙ্গে যােগাযােগ করলাম । দেখলাম কৃষক মেয়েরা তেভাগা আন্দোলনের পাশে দাড়াচ্ছে। আমি শহর থেকে গেছি। তাদের সঙ্গে মেশার জন্য চটি ছাড়তে হলো, সাধারণ ময়লা কাপড়ে থাকতাম। আমি যে তাদের নিতান্ত আপন এটা বোঝাবার জন্য আমাকে একদম কৃষকের বেশে থাকতে হতাে। ডোমজুড়, দক্ষিণবাড়ি, চাপাডাঙা, ঘাটাল পুরো এলাকা জুড়ে আমি এবং আমার লােক্যাল কমিটির তিনজন মেয়ে গ্রামে ঘুরে গৃহবধূদের, প্রত্যেকটি ভূমিহীন কৃষকদের ঘরে ঢুকে ঢুকে রাজনীতি বােঝাতাম, বােঝাতাম কীভাবে শােষণের প্রতিশােধ নিতে হবে। আমি সেখানে ছিলাম একবছর তিন-চার-পাঁচ মাস হবে, কিন্তু সরােজ দত্ত কোনাে খোঁজ খবর নিতেন না। ১৯৪৭-এর শেষের ঘটনা। তখন সরােজ দত্তের মা মারা গিয়েছিলেন। একজন লােক মারফৎ সরােজ দত্ত চিঠি দিলেন, মা মারা গেছেন, তােমাকে জানানাে দরকার, তাই জানালাম। তুমি তােমার কাজ ফেলে কিছুতেই এসাে না। এত তিনি কাজ ভালােবাসতেন। আমি কাজ করলে তিনি এত খুশি হতেন।
সরেজবাবুর প্রতিটি লেখা আমি পড়তাম এবং তার লেখার ভক্ত ছিলাম। শেষদিকের দেশব্রতীর লেখা গুলো আমাকে ভীষণভাবে উজ্জীবিত করতাে। দেশব্রতী হাতে পেলে প্রথমে তার লেখা পড়তেন চারু মজুমদার নিজে বলেছিলেন। তাঁর ক্ষুরধার লেখনীকে ভয় পেতােনা এমন কোনো প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি ছিলো না। আমি বিশ্বাস করি চারু মজুমদারই ভারতের মুক্তির পথনির্দেশক। আমার মনে হতে পার্টি যতক্ষণ বেঁচে আছে, চারু মজুমদার যতদিন বেঁচে আছেন ততক্ষণ আমি একা নই।
১৯৭০ সালে মহালয়ার দিন বিকেলে একবার এসেছিলেন (শেষবারের মতো)। বেশিক্ষণ ছিলেন না। ঘণ্টাখানেক ছিলেন। নানারকম কথাবার্তা বলে চলে যাওয়ার সময় আমি সাবধানে থাকতে বলেছিলাম। তিনি হেসে বললেন যে "সেনাপতির বুকে গুলি লাগবে বলে সেনাপতি কি যুদ্ধক্ষেত্রে যাবে না?"
সরোজ দত্ত যখন শহীদ হন, তখন তাঁর জন্য গর্ব হয়েছে। কিন্তু চারু মজুমদার চলে যাওয়ার পর 'কী হবে' ভেবে হতাশার ভাব এসে গেলাে, যে-ভাবটা অনেকদিন ছিলো। সম্প্রতি সেই হতাশা কাজ করছে না। অন্ধ্রে, বিহারে, দণ্ডকারণ্যে যেরকম সংগ্রাম চলছে, তাতে মনে হচ্ছে চারু মজুমদার, সরােজ দত্ত এবং যে হাজার-হাজার মানুষ প্রাণ দিয়েছে,ন তাঁদের স্বপ্ন সফল হবে।
[সরােজ দত্তের স্ত্রী – এটা কখনােই বেলা দত্তের প্রথম পরিচয় নয়। সরােজ দত্তের আগেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হয়েছিলেন এবং পেশাদার বিপ্লবী হিসাবে গ্রামে চলে গিয়েছিলেন তেভাগা কৃষক আন্দোলনের সংগঠক হিসাবে কাজ করতে। পার্টির নির্দেশে তাঁকে ফেরত আসতে হয়েছিল। আমৃত্যু বিপ্লবের প্রতি বিশ্বাস অটুট ছিল বেলা দত্তের।]
বটকৃষ্ণ দত্ত
পরের দিন ভাের হবার আগেই সরােজ চলে গেল। এটা হলো ১৯৬৯ সালের কথা। এরপর প্রত্যেক প্রদেশেই মুক্তাঞ্চল গঠিত হয়েছে। নকশালবাড়ীর স্ফুলিংগ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। কলকাতায় পাড়ায় পাড়ায় সংশোধনবাদীদের আক্রমণ আক্রমণ চলছে। দেশব্ৰতীতে নানা প্রদেশে জয়যাত্রার খবর। সরােজ দত্তের দেশব্ৰতীতে মসী যুদ্ধ এবং অসিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি চারু মজুমদারের নেতৃত্বে গ্রামে গ্রামে সংগঠন গড়ে উঠেছে। প্রেসিডেন্সি জেল, দমদম সেন্ট্রাল জেলের সিপিআই (এম এল) পার্টির বন্দীরা সংগঠন গড়ে তুলে কারার ঐ লৌহ কপাট লাথি মেরে ভেঙে বেরিয়েছে। যে জেল সাম্রাজ্যবাদীদের প্রধান দুর্গ ছিলো সে দুর্গ তারা দখল করেছে। মিলিটারী ও সেন্টাল রিজার্ভ পুলিশের কাছ থেকে রাইফেল ছিনতাই প্রতিদিনের ঘটনা হয়ে দাড়িয়েছে। যে সৈন্য যুদ্ধ করবে সে তার রাইফেল লােহার শিকল দিয়ে কোমরে বেঁধে বেড়াচ্ছে। হাস্যকর ব্যাপার—এই শােধনবাদীরা কাগুজে বাঘ ছাড়া আর কী ?
সরোজ মাঝে মাঝে সন্ধের পর আমার বাসায় আসতে। অনেকদিন তার কোনাে খবর নেই। প্রায় মাসখানেক আসে না। খবর দিলো আসবে । তার পর খবর যা এলো — তা তার মৃত্যু-সংবাদ। সে সেই রাত্রেই ধরা পড়েছে। গড়ের মাঠে গুলি করে মারে। তার মৃতদেহও এই কায়েমী স্বার্থবাদীদের ভয়ের কারণ, তাই তা গুম করে ফেলে। কারণ সেটা কবি সরােজ দত্ত কিংবা সাংবাদিক সরােজ দত্তের মৃতদেহ নয়, বিপ্লবী সরােজ দত্তের মৃতদেহ। ১৯৭১ সালের ৪ঠা আগস্ট সরোজ ধরা পড়ে। তার আগের দিন ৩রা আগস্ট ১৯৭১ সে তার শেষ সম্পাদকীয়তে লিখে যায় এই শেষ লাইন কটি - “তাই আজ পার্টির ভিতরে ও বাহিরে জোরদার করে তুলুন দুই লাইনের লড়াইকে এবং সংশােধনবাদী লাইনকে চূর্ণ করার মধ্য দিয়ে পার্টির ভিতরে ও বাহিরে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করান চারু মজুমদারের বিপ্লবী লাইনকে, যা আমাদের ঐতিহাসিক পার্টি কংগ্রেসের মুক্তির নিশানারূপে ভারতবর্ষের বিপ্লবী জনতার সামনে তুলে ধরেছে।”
আর চারু মজুমদার বলেছেন, "কমরেড সরােজ দত্ত পার্টির নেতা ছিলেন এবং নেতার মতই তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। তার বিপ্লবী নিষ্ঠা এক আদর্শ হিসাবে তরুণদের গ্রহণ করতে হবে। শ্রমিক ও দরিদ্র ভূমিহীন কৃষকের সাথে একআত্মা হয়ে এই হত্যাকাণ্ডের বদলা নিতে হবে"।
আমি আমার লেখা শেষ করছি। বয়স হয়েছে ৭৬/৭৭। কিন্তু খােকার উজ্জ্বল চোখ ও তার হাসি আমার সামনে আজও তেমন স্পষ্ট। আর মধ্যবিত্তের বিপ্লব বিলাস নিয়ে নিজে বেঁচে থেকে বলতে ইচ্ছে করে -
“মশা মেরে ঐ গরজে কামান - বিপ্লব মারিয়াছি।
আমাদের ডানহাতে হাতকড়া - বামহাতে মারি মাছি।”
[সরােজ দত্তের অগ্রজ। তিনি ছিলেন সরােজ দত্তের ‘ফুলদা’ আর সরােজ ছিলেন তাঁর প্রাণপ্রিয় ‘খােকা’ ও অন্তরঙ্গ বন্ধু।]
সুরেশচন্দ্র মৈত্র
সদ্য গঠিত প্রগতি লেখক সম্মেলনে সবাই হাজির হয়েছিলেন, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত থেকে সাজ্জাদ জহীর, বুদ্ধদেব বস্তু থেকে সমর সেন । সঙ্গে ছিলেন নীরেন্দ্রনাথ রায়, সুশােভন সরকার, হীরেন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ গােস্বামী ও সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার।
এরা সবাই উচ্চ শিক্ষিত বিশিষ্ট ব্যক্তি। এঁদের মত সরােজ দত্ত ছিলেন উচ্চশিক্ষিত এবং 'ভদ্রবংশীয়' সন্তান, কিন্তু সরােজ দত্ত ‘ভদ্র' ছিলেন না, তিনি ছিলেন অকপট মানুষ। সবাই আমরা জানি তিনি বুদ্ধদেব বসুর প্রগতিশীলতার আবরণ খুলেছেন। আসলে ওটা ছিল এক প্রতীক ঘটনা, ঘােমটা তিনি অনেকের খুলে দিলেন-“ছিন্ন কর ছদ্মবেশ” প্রবন্ধ লিখে (অগ্রণী, ১৯৩৯, ১ম বর্ষ, ২য় সংখ্যা)।
এ লেখা রাগ-দ্বেষ-ঘৃণায় জারিত করা লেখা, এ লেখা সত্যের প্রতি অকম্প আস্থার মাটিতে মজবুত লেখা। তখন আমরা কৈশাের পার হয়ে সবে যৌবনে পা দিচ্ছি, উত্তেজনায় বুকের পাঁজরা ক খানা কাপছে, তখন এই লেখা আমাদের মনে সাহস এনে দিল নতুন সাহিত্যকে বিচার করার। পুরান জিনিসকে শুধু ভাষার বা রীতির কারুনৈপুণ্য দিয়ে হাজির করলে তা নতুন সাহিত্য হয়না-নতুন সাহিত্যের রীতি শুধু নতুন হবেনা, বিষয়ও হবে নতুন। ভারতচন্দ্রের প্রমােদচর্চা নতুন ভাষায় বললে যদি নতুন সাহিত্য হােত, তবে ‘প্রগতি’ শব্দটির দুর্গতি রােধ করা দায়। যাঁরা এই মতাদর্শের বিরােধিতা করেন, সরােজ তঁাদের একজন। তখন ‘অগ্রণী’র জন্য আমরা সাগ্রহে অপেক্ষা করতাম—‘পরিচয়’ ‘কবিতা ‘শনিবারের চিঠি’ ‘প্রবাসী আমরা পড়তাম, কিন্তু প্রতীক্ষা করতাম ‘অগ্রণী’র জন্য। 'অগ্রণী' বাংলা সাহিত্যে তিন জন সাহিত্যিকের উদ্ভব সম্ভব করেছে - সুবোধ ঘোষ, বিনয় ঘোষ ও সরোজ দত্ত।
‘অগ্রণী’র দ্বিতীয় বর্ষে বের হােল সরােজ দত্তের সেই বহুখ্যাত প্রবন্ধ ‘আধুনিক বাংলা কবিতা। প্রবন্ধের লক্ষ্য যারা তাদের মধ্যে আজ বুদ্ধদেব নেই, সমর সেন আছেন । মাসে মাসে বুদ্ধিবিলাসী তাই ভরসা হয় একদা কবি ঐ ভদ্রলােক সাংবাদিক উড়াে খৈ নিবেদন করে চলেছেন কোন্ গােবিন্দের উদ্দেশে জানি না। তবে তার কুশাসনখানি পেতেছেন কোন এক হর্ষোৎফুল্ল বিপনণকেন্দ্রে। পুরােহিত মহাশয়ের সংসর্গ নির্বাচন দেব-নির্বাচনে সাফল্য লাভ করবে। সরােজ দত্তের পুরানো উক্তিটি এখনও দেখছি বাসি হােল না—“ইনটেলেকচুয়ালী কুসংসর্গ হইতে সাম্যবাদের সাবধান হইবার দিন আসিয়াছে”। মূঢ় সরোজ দত্ত ! তুমি নিজে মধ্যবিত্ত সন্তান হয়ে কত বড় ভ্রান্ত শিক্ষা দিচ্ছ ? মার্কসবাদ যে আমার আত্মীয় বিচ্ছেদ ঘটাবে, তা কি আমি সইতে পারি, না মানতে পারি ? আজও ত সেই কুসংসর্গে পড়ে আমরা দিন গুজরান করছি। .. অথচ সরােজবাবুও ছিলেন তখন প্রতিষ্ঠিত কবি। তাঁর কবিতার ধ্রুপদীবন্ধন তখন সকলের তাক লাগিয়ে দিত। সরােজ দত্ত দেশী বিদেশী মার্গ ও আধুনিক সাহিত্যে ভালােরকম দখল রাখতেন। সরােজ প্রায়ই বিজয় ঠাকুরের কাছে শেখ সেই পংক্তিটি আবৃত্তি করতেন -
‘দেখা হবে রণক্ষেত্রে অসিতে অসিতে'।
সরােজ তাঁর সাধনা অসমাপ্ত রেখেই চলে গেছেন—কিন্তু নিজেকে সম্পূর্ণ করে ফুটিয়ে দিয়ে গেছেন। তিনি মধ্যবিত্তের স্বপ্নবিলাস নন, তিনি মধ্যবিত্তের হীন লােভাতুরতার প্রতিবাদ। তিনি বিনয় ঘােষের মত খ্যাতিমান হন নি, বুদ্ধিজীবি হিসাবে সে তাঁর ভাগ্য ; সাংবাদিক হিসাবে সন্তোষ ঘােষের মত প্রতিপত্তিশালী হন নি, সেও তাঁর ভাগ্য ; সম্পাদক হিসাবে বিবেকানন্দের মত ইউরােপ ও সােভিয়েট ভ্রমণপটু হননি, তাও তাঁর ভাগ্য। বিশ্বাসঘাতকতা আর প্রগতিশীলতা মিশিয়ে এক অদ্ভুত জগাখিচুড়ি ভারতবর্ষে প্রস্তুত হয়েছে বিদেশী রাষ্ট্রশক্তির রন্ধনশালায়। তবু ভারতবর্ষ স্বাধীন। সেই খিচুড়ি জগারাই ভক্ষণ করুক।
জীবনদান করে সরােজ আমাদের সকলের মিথ্যা বেশ ও ছদ্মবেশ ছিন্ন করতে চেয়েছেন — বৃহন্নলারা আর কতকাল বিরাটসভায় দাসীবৃত্তি করবে ? ক্ষেত্র পড়ে আছে—রণ হবে কবে !
[সুরেশচন্দ্র মৈত্র-র সঙ্গে সরােজ দত্তের সম্পর্ক ১৯৩৯ সাল থেকে। রাজনীতি কাছে এনেছে, আবার দূরেও ঠেলেছে দু’জনকে। কিন্তু বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল অটুট। সরােজ দত্ত শহিদ হওয়ার চারদিন আগে দু’জনের শেষ দেখা হয়েছিল।]
কানাই পাকড়াশী
‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায় সােমনাথ লাহিড়ীর মতো প্রথম যুগের কিংবদন্তী পুরুষ ছিলেন না তিনি, তবে জ্যোতি বসু সম্পাদক থাকার সময়ে বা সরােজ মুখার্জির অমিলে স্বাধীনতা’ পত্রিকার প্রধান পুরুষই তিনি। স্বাধীনতা পত্রিকার প্রতিটি কর্মী ব্যক্তিগতভাবেও তার কাছে ঋণী ছিলো বলা যায়। তাঁদের পরিবারের সমস্যাকে নিজের পরিবারের সমস্যা হিসেবেই দেখতে অভ্যস্ত ছিলেন তিনি।
প্রেসের কম্পােজিটর থেকে আরম্ভ করে ঝাড়দার পর্যন্ত তাদের মস্যা নিয়ে সরােজদার কাছে আসতো, কোনাে বাধা ছিল না। সর্বসময়ের কর্মী ছিলাম যারা তাদের অনেকেরই বাড়ির অবস্থা খারাপ থাকায় দৈনন্দিন ভাত ডাল ছাড়া আর বিশেষ কিছুই জুটত না। সয়ােজদা অনেক সময় কোনাে নেমন্তন্ন পেলে তার দলবল নিয়ে হাজির হতেন সেই উৎসব-বাড়িতে। মাঝে মধ্যে তাদের পাতে মাছ মাংস পড়বার ব্যবস্থা হত।
‘স্বাধীনতা’-র রবিবারের পাতায় ছিল তাঁর অবাধ সঞ্চরণ। যই বা সিনেমা সমালােচনায়ও থাকত তার নিজস্ব স্বাক্ষর। কাউকে সহজে রেহাই দিতেন না। ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কোনাে আদর্শগত দ্বন্দ্বে পাত্তা দিতেন না। বন্ধু-বিচ্ছেদের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তাঁর মনের সত্যকে গােপন করতে শেখেন নি তিনি।
[স্বাধীনতা পত্রিকায় সরােজ দত্তের সহকর্মী ছিলেন।]
হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়
কোনও কোনও রচনায় একটু যেন কটাক্ষ করে বলা হয়েছে যে অরুণ মিত্র, বিজন ভট্টাচার্য, বিনয় ঘােষ, স্বর্ণকমল ভট্টাচার্য, সরোজ দত্ত প্রমুখের ‘অরণি' পরিচালনা করতেন আর কবি বিষ্ণু দে-র একজন ঘনিষ্ঠ অনুরাগী রূপে আমি বুঝি এই অরণি-সম্পর্কিত - লেখকদের বিষয়ে একটু বিরূপ ছিলাম। কথাটা ঠিক নয়। এঁদের সকলের সঙ্গেই আমার সৌহার্দ্য ছিল, বিশেষত অণবাবু বা বিজনের মতে কমরেডের সঙ্গে। সাহিত্য-বিচার নিয়ে মাঝে মাঝে স্বল্প মতভেদ সত্ত্বেও সে-সৌহার্দ্য ক্ষুন্ন কখনও হয়েছে বলে জানি না।
কমরেড সরােজ দত্তের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্কও ছিল পরিপূর্ণ সৌহার্দের । কখনও কোনও ব্যক্তিগত তিক্ততা হয়েছিল বলে আমার স্মরণে আসে না। তবে সাহিত্য-বিচার বিষয়ে মতভেদ মাঝে মাঝে যে ঘটেনি তার নয়।..
সরােজবাবু যখন ‘দেশব্রতী’ বা অনুরূপ প্রয়াসে কায়মনােবাক্যে লিপ্ত তখন প্রায় বছরের সব সময় আমি বাইরে। তাকে আমি সর্বদাই স্মরণ করি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে। এটা কেবল তার সাহিত্য সৃষ্টির জন্য নয় তা নিয়ে তাে মাঝে মাঝে মতানৈক্য ঘটেছে। তিনি নিজের বিবেক ও সমাজ-চিন্তার ভিত্তিতে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন আর শেষ পর্যন্ত শহীদের বরমাল্য তার প্রাপ্য হল । এ কথা ভাবলে স্বভাবতই তার সম্পর্কে আমার শ্রদ্ধা আরও বৃদ্ধি পায় আর ভাবি যে এই ধরনের মানুষ আমাদের মধ্যে জন্মান বলেই তাে ভবিষ্যতের আশা একেবারে বিনষ্ট হয় না।
[ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃস্থানীয় সদস্য, বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ।]
জ্যোতি রায়
সরােজ দত্ত শহীদ হয়েছিলেন, তিনি প্রতিভাবান সাংবাদিক ছিলেন, বিশ্বসাহিত্যের খবর রাখতেন এই সব মামুলি কথায় সরােজ দত্তের সেই দিকটি ধরা পড়ে না, যার জন্য তিনি ইতিহাসে স্থান পাবার যােগ্য। পল এলুয়ারের গেব্রিয়েল পেরীর উপর একটি অসাধারণ কবিতা আছে। কবিতাটি হাতের কাছে নেই কিন্তু তার পুরো রেশটুকু একটি গানের মতাে মনে আছে। পেরীকে নাৎসীর। বন্দী করে । ফ্রান্সের অন্যতম কমুনিস্ট নেতা হিসাবে তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় । সিদ্ধান্তটি কাজে লাগাবার আগে নাৎসীরা একটি চাল চালে । তার গেব্রিয়েল পেরীর কাছে প্রস্তাব রাখে – তিনি কমুনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করলে তার মৃত্যুদণ্ড রদ করা হবে। পেরী কিন্তু এই সব ফাঁদে আদৌ পা দেন নি। তিনি একটি বিবৃতিতে বলেন যে যদি তাঁকে আদৌ মুক্তি দেওয়া হয় তিনি কমুনিস্ট আন্দোলনের পথেই চলবেন। শেষ পর্যন্ত নাৎসীরা পেরীকে হত্যা করে। এই ঘটনাকে এয়ার ‘Towards a Singing Tomorrow কবিতায় ধরে রাখলেন। এলুয়ার লিখেছেন—পৃথিবীতে অনেক ফলের নাম আছে, আছে অনেক ফুলের নাম, আছে নদীর নাম, পর্বতের নাম, সেই সব নামে নামে যুক্ত হয়ে থাক পেরীর নাম।
ফ্রান্সকে বলা হয় চারটে বিপ্লবের দেশ। সরােজ দত্ত জন্মেছিলেন এমন এক দুর্ভাগা দেশে যেখানে একটা বিপ্লবের দানা বাঁধতেই অর্ধশতাব্দীর উপর সময় কেটে গেছে। তাই তাঁর ছিন্নমস্তক কুয়াশা ভেদ করে শুধু কাকেরা দেখে গেল। নিশ্চিন্তে চলে গেল ঘাতকেরা। নিঃশব্দ নিথর একটি ঐতিহাসিক প্রাণদান।
কেন সরােজ দত্তর হত্যা ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, সেই সম্বন্ধে আমরা আজও বােধহয় ভাবনা চিন্তার দায় নিইনি, এটা আমাদের সমাজের সর্বস্তরের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সাফল্য। প্রথমেই বােঝার চেষ্টা করতে হবে সরােজ দত্তকে এইভাবে হত্যার সিদ্ধান্ত নিতে প্রশাসন তথা তার পুলিশ তখনই পারে যখন তারা বুঝতে পারে সরােজ দত্তদের মতাে অগ্রগামী অংশকে সমাজের অন্য রাজনৈতিক দলগুলি স্বীকৃতি দিতে সম্পূর্ণ নারাজ এবং সমাজের অধিকাংশ মানুষ এখনাে রাজনৈতিক চেতনার দিক থেকে সম্পূর্ণ অপরিণত।
১৯৪৮-এ আমি সরােজ দত্তকে শেষবার দেখি অবিভক্ত কমুনিস্ট পার্টির সাহিত্য সেলের নেতৃত্বে। তারপর দীর্ঘ দু’দশকের বেশি সময় কেটে যায় ; আমরা নিজেরাই জানতাম না কে কোথায় আছি। ১৯৭০-এর পরবর্তী সময়ে দেখেছি একেবারে পথের মানুষের মধ্যে মাওবাদী আন্দোলন ঢেউ দিয়েছে। পুলিশের সঙ্গে প্রাণের রক্তাক্ত খেলা চলেছে। কবিদের কল্পনাকে হার মানিয়ে দিচ্ছে মানুষের সাহস, স্বপ্নের জন্য নির্দ্বিধায় প্রাণ দেওয়ার তাগিদ। এমনি একটি সময়ে সরােজ দত্তের ধড় পড়ে থাকে কোনাে এক ভােরে কুয়াশায় ভেজা ময়দানে। বীর গাথা, মহাকাব্যের এই সুনিশ্চিত আত্মনিধনকে বেছে নিলেন তিনি, কেননা সরােজ দত্ত তার মধ্যবিত্ত জীবনযাত্রার খাতে বাঁচার অনেক সুযােগ পেতে পারতেন। চমৎকার লেখক, তীক্ষ্ণধী ঐতিহাসিক চেতনাসম্পন্ন একটি মানুষ, আপােষ না করেও আর কিছুদিন থাকতে পারতেন; কিন্তু এইসব পাশে সরিয়ে মৃত্যুকে বেছে নিলেন। এই জীবন দান যেমন একটি রাজনৈতিক আলােচনার বিষয়, তেমনি বিষয় দার্শনিক বিশ্লেষণেরও।
[অবিভক্ত পার্টির যুগে ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের অগ্রণী সংগঠক ছিলেন।]
শৈবাল মিত্র
কবি, অনুবাদক হিসেবেই শুরু হয়ে ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবন। মনটা ছিল কবির। গভীর, গম্ভীর আলোচনার মধ্যে হঠাৎ একটা সরস মন্তব্য করে বসন্তের বাতাস বইয়ে দিতেন। ছােটখাটো শরীর, রাশভারি স্বভাব, সরোজ দত্ত ছিলেন অফুরন্ত প্রাণশক্তির উৎস। নকশালপন্থী রাজনীতিতে আসার আগে পর্যন্ত তাঁর গদ্যরচনার অধিকাংশ হলাে সাহিত্য-সংস্কৃতিবিষয়ক। ফরাসি লেখক রােমাঁ রােলাঁর আত্মজীবনী 'আই উইল নট রেস্ট'-এর বাংলায় তিনি ভাষান্তর করেন। গাের্কির নানা লেখা, লেনিন-সহধর্মিণী ক্রুপস্কায়ার লেনিনস্মৃতি, তুর্গেনিতের 'স্প্রিং টরেন্ট', তলস্তয়ের 'রেসারেকশন'-এর বঙ্গানুবাদ করেছিলেন। রােলাঁর 'আই উইল নট রেস্ট'-এর বাংলায় নামকরণ করেছিলেন 'শিল্পীর নবজন্ম'। মূল নামের আক্ষরিক বঙ্গানুবাদ হতে পারতাে - 'আমি থামবাে না', 'আমার অবসর নেই' অথবা 'আমি অক্লান্ত' - এই রকম কিছু। কিন্তু নাম হলো, 'শিল্পীর নবজন্ম'। নামকরণটি তাৎপর্যমণ্ডিত। রােলাঁর গ্রন্থে জন্ম, মৃত্যু, পুনরুথানে মানবচেতনার বিরামহীন রূপান্তর প্রকাশ পেয়েছে। সরােজ দত্তর জীবন আর বিশ্ববীক্ষাও ছিল তাই। ইতিহাসের আঁকাবাঁকা জটিল বিভিন্ন পর্বে তার পুনর্জন্ম ঘটেছে। কবি, প্রাবন্ধিক, সমালোচক থেকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের নেতা। একজন বিপ্লবী বুদ্ধিব্রতীর যা হওয়া উচিত, শেষ পর্যন্ত তিনি তাই হয়েছিলেন। কবিতা লিখলেই কবি হওয়া যায় না। 'কবিতার কথা' গ্রন্থে জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন, সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি । মুষ্টিমেয় সেই কবিদের একআধজন বিপ্লবী হয়ে ওঠেন। বিপ্লবী কবিতা লিখলেই বিপ্লবী হওয়া যায় না। কবিরা সহজে বিপ্লবী হন না। কিন্তু কবি না হয়ে বিপ্লবী হবার উপায় নেই। প্রকৃত বিপ্লবী মাত্রই কবি । তবে কবিসত্তার চেয়ে তাদের বিপ্লব সত্তাই প্রখর থাকে। কোনে। অবস্থাতেই তাঁর কবিতা আর বিপ্লব একাকার করে ফেলে । কবি যখন বিপ্লবী হন, তখন কি উল্টোটা ঘটে ? কবিতার স্বপ্নে কি তিনি বিপ্লবকে আচ্ছন্ন করে? এরকম ঘটা অসম্ভব নয়। বিপ্লবীর মতো কবিও বাস্তবতার দু'টি স্তরে বাস করেন। দৃশ্যমান বাস্তবের চেয়ে তার কাছে বড়ো হয়ে ওঠে আকার বাস্তব। দৃশ্যমান বাস্তবে নিজেকে নিঃসঙ্গ, ভিনদেশী মনে হয় তাঁর। সেই বাস্তব থেকে আড়ালে সরে থাকতে চান তিনি। বিপ্লবীর মতো তিনিও স্থিতাবস্থার বৈরী, কিছু পরিমাণে আত্মগােপনকারী। বিপ্লবী যখন বাস্তব অবস্থার আমূল রূপান্তরে আত্মােৎসর্গ করেন, চেতনার জগতে তখন বিপ্লব ঘটাবার স্বপ্ন দেখেন কবি। বিপ্লবী আর কবির এখানেই মানসিক সাযুজ্য! পৃথিবীর বিপ্লবী ইতিহাসে তাই ঝাঁকে ঝাঁকে সামিল হয়েছেন কবি লেখক শিল্পী স্রষ্টারা। বিপ্লবীর; কবিতা লিখেছেন, অহরহ আবৃত্তি করেছেন, মানব-ইতিহাসের উজ্জ্বল সম্ভাবনা সম্পৃক্ত কবিতা। কিন্তু একজন বিপ্লবীর কর্মপদ্ধতির সঙ্গে একজন কবির সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার পার্থক্য আছে। বিপ্লব যতােটা মূর্ত, কবিতা তা নয়। কবিতা মূলত বিমূর্ত। মূর্ত কর্মসূচির যারা রূপকার, তারা সমাজস্রষ্টা। চেতনার জগতের চেয়ে বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে তাদের বেশি যােগাযােগ। তারা জানেন, কোথায় থামতে হয়। কবিতার শুরু আর শেষও তাঁরা জানেন। চেতনজগৎ নিয়ে মশগুল করি কাছে কবিতার শুরু নেই, শেষও নেই। শুরুটা জানলেও তিনি শেষ জানেন না। চেতনার নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহের যতেই কবিতা তার কাছে অনিঃশেষ। প্রবাহের শেষ মানেই যতি, ছেদ, বিরতি, মৃত্যু। কবি আর বিপ্লবীর মানসিক গঠনে তফাৎ হলো, মূর্ত থেকে বিমূর্তের দিকে যখন একজন ধাবমান, অন্যজন তখন বিমূর্তকে মূর্তিমান করতে প্রয়াসী । প্রশ্ন হলো, সরােজ দত্ত কী চেয়েছিলেন ? তার কবিসত্তা আর বিপ্লবীসত্তার সমন্বয় কতােটা ঘটেছিল ? কোথাও কি স্ববিরােধ ছিল ? স্ববিরােধ থাকা সম্ভব এবং সেটা অসঙ্গত নয়। বস্তুবিশ্বের মতাে মানুষের স্বভাবেও বিরােধ আছে। তবে সরােজ দত্তর স্ববিরােধের প্রকৃতি ছিল আলাদা। বিরােধটা কবিসত্তা আর বিপ্লবীসত্তার নয়। বিরােধ ছিল দুটি সত্তার অভ্যন্তরে। বলা যায় কবিসত্তার অন্তর্বিরােধ ছিল, বিপ্লবীসত্তারও অন্তর্বিরােধ ছিল । বিরােধের নমুনা তাঁর পদ্য গদ্যে ছড়িয়ে আছে।
ইংরেজি সাহিত্যে সুপণ্ডিত ছিলেন তিনি। সংস্কৃতেও ব্যুৎপত্তি ছিল। ইংরেজি, জার্মান, রুশ সাহিত্য থেকে যেমন অনুবাদ করেছেন, তেমনই পদে পদে অনুভব করেছেন সংস্কৃত সাহিত্য আর ভারতীয় ঐতিহ্যের প্রভাব। প্রাচীন সংস্কৃত কাব্য, নাটক, দর্শনের প্রসঙ্গ তার লেখায় বারবার এসেছে। শকুন্তলার দুর্ভাগ্য, যুধিষ্ঠিরের পাশাখেলার মতাে মূর্ত বিষয় তার কবিতায় বিমূর্ত হয়ে ওঠার বদলে অধিকতর মূর্ত হয়েছে। উল্টোদিকে তিনি যখন শশাঙ্ক ছদ্মনামে দেশব্রতীর পাতায় সাপ্তাহিক নিবন্ধ লিখেছেন, বিমূর্ত বিষয়গুলি সেখানে প্রায় নিরাকার হয়ে গেছে।
ষাট দশকের শেষ দিকে তার প্রবন্ধ, নিবন্ধের ভাষা পর্যন্ত বদলে গিয়েছিল। উৎসভাযায় তিনি ফিরে যেতে চাইছিলেন। এই সময়ের কিছু দেওয়াল-লিখনের ভাষ। তাঁকে প্রেরণা দিয়েছিল। তাঁর মনে হয়েছিল, ক্রোধ আর ঘৃণা প্রকাশের জন্য এটাই সেরা ভাষা-শৈলী। দেশব্রতীর নিবন্ধে দু'একটা দেওয়াল-লখন উদ্ধৃতি হিসেবে তিনি ব্যবহার করেছিলেন। যতােদূর আনে পড়ে, এক অত্যাচারী পুলিশ কর্তাকে হুকি দিয়ে লেখা একটি দেওয়াল-লিখন অশুদ্ধ বানানসহ তিনি রচনাতে তাই দিয়েছিলেন। উদ্ধৃতিটি হলো, 'শুয়ােরের বাচ্চা অমুককে কাঁটারি দিয়ে কাঁটবো'। 'কাঁটারি' এবং 'কাঁটবো' শব্দদুটির অনুনাসিকতা তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। এরকম একাধিক উদ্ধৃতি ব্যবহার করে ব্রাত্যজনের মুখের ভাষা যে সুধী বাঙালির মুখের ভাষার চেয়ে অধিকতর জীবন্ত আর কার্যকর, তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন। আপাত মূর্ত উৎস ভাযা যে শেষ পর্যন্ত কতো বিমূর্ত নিরাকার হয়ে উঠতে পরে, তাঁর এই পর্বের গদ্যশৈলী পড়ে বোঝা যায়। তাঁর গদ্যশৈলী আগাগােড়া পরিবর্তিত হয়েছিল। দেশব্রতীর পাতায় শৈলী পরিবর্তনের অসংখ্য উদাহরণ ছড়িয়ে আছে।
ষাট, সত্তর দশকের ঘটনাবলী সরােজ দত্তকে অবস্থান পাল্টাতে বাধ্য করছিল। চেতনার নির্মাতার ঘাড়ে অর্পিত হয়েছিল সমাজ রূপান্তরের দায়িত্ব। সরােজ দত্ত দায়িত্ব এড়াতে পারেননি। এড়াতে চান নি। সৃজনশীল স্রষ্টা হয়ে উঠলেন শ্রেণীসংগ্রামের সেনাপতি। যাত্রা ভঙ্গ করেননি তিনি। নৌকো পুড়িয়ে তীরে নেমেছিলেন। আত্মপ্রচারবিমুখ এই মানুষটিকে ইতিহাস রক্ষা না করলেও অবিস্মরণীয় করে রেখেছে।


Comments