গীতিকার থেকে গণগীতিকার

Updated: Aug 3, 2021
পরেশ ধর

'শান্ত নদীটি পটে আঁকা ছবিটি'-র 'আকাশে লাল রঙ'-এ বদলে যাওয়ার এক বিরল আখ্যান।
১৯১৮ সাল। রুশ বিপ্লব, পরাধীন ভারতে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম, বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদীদের ক্ষমতার লড়াই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আজকের দিনটিতে (৯ আগস্ট) উত্তর কলকাতার গরানহাটায় জন্ম হয় পরেশ ধরের।
বাড়িতে সঙ্গীতের একটি আবহ ছিলই। বাবা ছিলেন তবলাবাদক। কাকা ছিলেন আলাউদ্দীন খাঁ সাহেবের ছাত্র। পরিবারের এই প্রভাবে তিনি নিজে নিজে বাঁশি শিখতে শুরু করেন। পরে রাগ সঙ্গীতের পাঠ নেন জোড়াবাগানের রামকানাই ভট্টাচার্যের কাছে। এভাবেই তাঁর গানের জগতে প্রবেশ। কলেজে পড়তে পড়তেই তিনি আকাশবাণী কলকাতা থেকে বাঁশি বাজানোর অনুষ্ঠান পেতে শুরু করেন। বেশ কম বয়সে থেকেই তিনি তাঁর লেখা কবিতা, গান, নাটক ও যাত্রাপালার জন্য খ্যাতি পেতে শুরু করেন। সঙ্গীতশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গলায় তাঁর লেখা বেশ কয়েকটি গান খুব জনপ্রিয় হয়। এইচ.এম.ভি.-তে তিনি বেশ কিছুদিন প্রশিক্ষকের ভূমিকায়ও ছিলেন তিনি।
১৯৪৬ সালে, গণনাট্য সংঘের সংস্পর্শে আসেন তিনি। সলিল চৌধুরীর গানে অনুপ্রাণিত হয়ে যোগ দেন ভারতীয় গণনাট্য সংঘে। রোম্যান্টিক গানের সহজ জনপ্রিয়তা ছেড়ে রচনা করতে শুরু করেন গণসংগীত। জনগণের কথা, জনগণের প্রতিরোধের আপোসহীন ভাষা প্রতিফলিত হতে থাকে তাঁর গানে। আপোস ব্যাপারটাই ধাতে ছিল না তাঁর। মতাদর্শের ফারাক হওয়ায় ১৯৫০ সালে তিনি গণনাট্য সংঘ ছেড়ে বেরিয়ে আসেন।
নকশালবাড়িতে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ পরেশ ধরকে আন্দোলিত করেছিল। জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং বিপ্লবে তাঁর আস্থা একটা স্পষ্ট রাজনৈতিক রূপ পেয়েছিল সাতের দশকেই। পরবর্তী সময়ে তিনি এম.সি.সি. (মাওবাদী কমিউনিস্ট কেন্দ্র) রাজনীতির ঘনিষ্ঠ হন এবং একজন মাওবাদী সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে আমৃত্যু বিপ্লবের প্রতি আস্থাশীল থাকেন। জীবনের শেষ দিনটি অবধি তিনি থেকে গিয়েছিলেন বিপ্লবী লেখক শিল্পী বুদ্ধিজীবী সংঘের সভাপতি।
বিশ শতক জুড়ে বাংলা ভাষায় রচিত পরেশ ধরের কবিতা, গণসংগীত, গীতিনাট্য, যাত্রাপালা এদেশের জনগণের সংস্কৃতির ধারার এক পূর্বাপর বিবরণী। প্রায় চারশো' গান রচনা করেছিলেন তিনি। তার মধ্যে অর্ধেকের বেশিই হল গণসংগীত। সরকারের রোষানলেও পড়েছিল তাঁর গান । আকাশবাণী কর্তৃপক্ষের আপত্তিতে, 'কারখানা কলে' গানটির সব রেকর্ড ভেঙে ফেলে গানটির বিক্রী বন্ধ করে দেয় গ্রামোফোন কোম্পানি। কিন্তু যুগ পেরিয়ে ইতিহাস সাক্ষী যে শাসকের রক্তচোখ বিপ্লবী স্পৃহাকে কখনই দমিয়ে দিতে পারে নি।
গণগীতিকার হয়ে ওঠার পরে শেষ দিন অবধি পরেশ ধরকে উপহাস শুনতে হয়েছে "উনি তো গান লেখেন না, স্লোগান লেখেন" বা "মেঠো কবি" ইত্যাদি বলে। অবিচল পরেশ ধর কিন্তু বুঝেছিলেন নাগরিক ‘সংস্কৃতিমনস্কতা’র পরিসরে নয়, তাঁর গানের বেশি প্রয়োজন মেঠো মানুষজনের কাছেই, বিপ্লবটা যাঁদের কাছে পছন্দ অপছন্দের ব্যাপার নয়, বাধ্যতা। সচেতনভাবেই সুললিত রোম্যান্টিক গানরচনার দক্ষতা আর পরিচিতির মোহকে ছেঁড়া কাগজের মতো ফেলে দিয়ে মেঠো ভাষাকে মাধ্যম করার মতো সাহস তাঁর ছিল, তাকে অক্ষমতা বলে পরিহাস আসলে সেই বদলে যাওয়ার সাহসকে ধরতে না পারার ব্যর্থতা।
এই বদলে যাওয়ার খতিয়ান হিসাবে আমরা শুধু তাঁর দুই পর্বে লেখা দু'টি গানের অংশকে তুলে দিচ্ছি। প্রথমটি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গলায় সবসময়ের সেরা জনপ্রিয় বাংলা গানের তালিকায় আসে।
"শান্ত নদীটি, পটে আঁকা ছবিটি
একটু হাওয়া নাই, জল যে আয়না তাই
ঝিম ধরেছে ঝিম ধরেছে
গাছের পাতায়
পাল গুটিয়ে থমকে গেছে
ছোট্ট তরীটি, আহা ছোট্ট তরীটি
শান্ত নদীটি..."
আর দ্বিতীয়টি, পড়লেই বোঝা যায় পরের পর্বে লেখা।
"বিহার বিহার অন্ধ্র অন্ধ্র
ডাক পাঠালো মেঘমন্দ্র
বিহারে চাষী জেগেছে, আকাশে লাল রং লেগেছে
অন্ধ্রে চাষী গর্জমান বিহারে অন্ধ্রে ঐকতান।
বিহারে অন্ধ্রে হাতে হাত, মিলিছে তাদের প্রাণে প্রাণ।
যে হাতে লাঙল ধরো ভাই, সে হাতে রাইফেল ধরা চাই
ভূমিসেনারা এলে পর গণসেনা যে ভয়ঙ্কর।
তারা সাহসে এগিয়ে যায়, নাইরে দ্বিধা নাইরে ডর।
অন্ধ্র বিহার হাঁকে রে, গোটা ভারত কাঁপে রে
জনযুদ্ধের সঠিক পণ আনলো দেশে আলোড়ন
মজুর কিষাণ মিলেছে চূর্ণ করতে দুঃশাসন।"
এমনই ছিল তাঁর বদলে যাওয়ার আখ্যান। এমনই ছিলেন পরেশ ধর।




Comments