top of page

নোয়া'জ আর্ক

  • Writer: আনোয়ার হোসেন
    আনোয়ার হোসেন
  • Sep 28, 2021
  • 13 min read

নাটকের ঘন্টা পড়ার পরেই বিজ্ঞাপন:

আপনার ফসল কে হানাদারের হানাদারি থেকে রক্ষা করতে ব্যবহার করুন, হিপকো কোম্পানীর

কীটনাশক, কোলাপ্সিডল।


[বিজ্ঞাপন চলতে চলতে ধীরে ধীরে পর্দা খোলে। দেখা যায়, হ্যারিকেনের আলোর সামনে একটা

রেডিওকে ঘিরে গুটিকয় ছায়ামানুষ। রেডিওর অনুষ্ঠান গুনছে।]


ঘোষিকা: .

আকাশবাণী কলকাতা। এখন শুনবেন একটি কথিকা। বিষয়, উন্নত প্রযুক্তির চাষ ও পৃথিবীর

ভবিষ্যত। পাঠ করছেন, ডক্টর অংশুমান নায়েক।


কথিকা পাঠক:

আদিম যুগে, প্রায় ৯০০০ থেকে ১২০০০ বছর আগে, বনবাসী মানুষ চাষ-আবাদ শিখে গ্রামীন সভ্যতার সূচনা করেছিল। আজকের পৃথিবীতে অধিক ফলনের জন্য এসেছে নানান প্রযুক্তি। এসেছে রসায়নিক সার, কীটনাশক ও জিন প্রযুক্তির বীজ। কৃষিবিজ্ঞানী ও পরিবেশ বিজ্ঞানীদের অনুমান, এই তিন প্রযুক্তি আগামী দিনে মানব সভ্যতাকে সংকটের সুখে ফেলে দিতে পারে। এই তিন প্রযুক্তির উপর দিন দিন চাষী তথা সমগ্র মানুষের নির্ভরশীলতা যেমন বাড়ছে তেমনি বাড়ছে বিপদের সম্ভাবনা। প্রতিবছর ভারতে প্রায় ২ কোটি টন অজৈব রসায়নিক সার উৎপাদন হয়, বিগত ৫০ বছর আগের তুলনায় যা ৩৬৪ গুন বেশি। এই অজৈব রসায়নিক সার জল ও মাটির সাথে মিশে...............(রেডিও ঘড় ঘড় শব্দ করে, কথা শোনা যায় না। একটু পরেই আবার পরিষ্কার শোনা যায়) প্রতি বছর পৃথিবীর জল ও মাটিতে প্রায় ২৫ লক্ষ টন কীটনাশক মিশে যায়, যা পরে খাদ্য ও পানীয়ের গাথে মেশে। সমীক্ষায় জানা গেছে, খাদ্য ও দুধে কীটনাশকের মাত্রা ভারতে সবচেরে বেশি। শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এর প্রভাবে প্রতিবছর আনুমানিক ৭ কোটি পাখির মৃত্যু ঘটে আর ৭০,০০০ শিশু বিষক্রিরায় আক্রান্ত হয়। রক্তের ক্যান্সার সহ অন্যান্য মারাত্মক রোগের শিকার হন অসংখ্য মানুষ। খাদ্যশৃঙ্খল ও জীব-বৈচিত্র নষ্ট করে আগামী বিপদ কে ছাড়পত্র দিচ্ছি আমরা। সবশেষে বলি, আধুনিক প্রযুক্তি কৃষিতে এনেছে বিপ্লব সমাধান করেছে খাদ্য সনস্যা। কিন্তু ভবিষ্যত ? ভবিষ্যতের পৃথিবীকে একটি প্রাণহীণ গ্রহে পরিনত করবেনা তো?


ঘোষিকা: কথিকাটি শেষ হল। এটি পাঠ করলেন, ডক্টর অংশুমান নায়েক। আকাশবাণী কলকাতা। একটু পরেই শুনবেন নাটক।


বিজ্ঞাপন: হিপকো কোম্পানীর উন্নত প্রযুক্তির বীজ ও রসায়নিক সার,

আপনার জমিতে আনে ফসলের জোয়ার।


ঘোষিকা: এখন শুনবেন নাটক, নোয়াজ আর্ক। রচনা - আনোয়ার হোসেন, প্রযোজনা - ..........., সম্পাদনা - ........., নাটক, নোয়া’জ আর্ক।


[মঞ্চ অন্ধকার---জলোচ্ছাসের আবহ---মধ্যে মধ্যে আর্ত চিত্কার পর্দা ধীরে ধীরে খুলতেই দেখা যায় আলখাল্লা পরিহিত নোয়া একটা নৌকার উপর দাঁড়িয়ে]

নোয়া:ধ্বংস হোক, মানুষের পৃথিবীতে যা কিছু অকল্যাণকর---ধুংস হোক। ধ্বংস হোক, ভালবাসার পৃথিবীতে যারা নিয়ে এসেছে অবিশ্বাস—

-- ধ্বংস হোক। তোমাদের জন্য আমার কষ্ট হয় ; ধ্বংসের বার্তা নিয়ে বিষ বাতাস ঘা দিয়ে গেছে তোমাদের জানালায়, তোমরা কপাট খোলোনি। তোমাদের জন্য আমার কষ্ট হয়; ধীরে ধীরে অনিবার্য হয়ে উঠেছিল এ মহাধ্বংস, কিন্তু তোমরা তা দেখতে পাওনি । তোমাদের জন্য আমার কষ্ট হয়। প্রত্যাশিত ছিল এ মহাপ্নাবন, বহু প্রতীক্ষিত এ কুজ্ঝটিকা, অনিবার্য এ মহাধ্বংস। ধ্বংস হোক---- ধ্বংস হোক--- ধ্বংস হোক---- ধ্বংস হোক ।


[আবহে ঝড়ের শব্দ ফিকে হয়। আলোতে ভোরের আভাস। গা থেকে আলখাল্লা খসে পড়ে নোয়া এখন সাধারন কৃষক । গানের দলের প্রবেশ । গান শুরু হয় । গান চলার সময় নোয়া নিয্নলিখিত কাজগুলি নোয়া করে --- পান্তাভাত খাওয়া, ঘটির জলে হাত মুখ ধোয়া, একটা পাখি এসে মুখ থুবড়ে পড়ে পায়ের কাছে, নোয়া জল খাওয়ায়, পাখি উড়িয়ে দেয়, মৃত পাখি পায়ের কাছে আবার পড়ে যায়, নোয়া খেয়াল করেনা।]


গানের দল: (গাজীর গানের সুরে)

আমি আগে করি পয়গন্বরের চরণ বন্দনা

তারপরেতে নোয়ার গান শুনেন সর্বজনা

শুনেন বন্ধুগন ২ দিয়া মন পুরাকালের কথা

কইতে আমার চক্ষু ভাসে মনেতে পাই ব্যথা

নোয়া নবী ছিল ২ দ্যাশটা গেল পাপাচারে ভরে

সোজা পথে চলতে নোয়া তাগো আদেশ করে

তারা দেয়না পাত্তা ২ সত্য মিথ্যা বিচার নাহি জানে

হিত অহিত ছোট বড় বিচার নাহি মানে

নোয়া বাধ্য হয়ে ২ ব্যথা পেয়ে ভগবানে বলে

এমনি করে ভুবনডাঙা আর তো নাহি চলে

একটা কিছু কর ২ মার মার যত পাপীদেরে

তারপরেতে ভুবনডাঙা বাঁচবে নতুন করে

এল মহাপ্লাবন ২ নোয়া তখন জাহাজেতে চড়ে

সকল জীবের নমুনা সে সংরক্ষণ করে

যত পাপী তাপী ২ খেয়ে খাবি মরে গেল ডুবে

নতুন করে পৃথিবীটা গড়বে নোয়া ভাবে

প্লাবন থেমে গেল ২ নেমে এল নোয়া জাহাজ হতে

নতুন ফসল উঠল নেচে নতুন ধানের ক্ষেতে

তারপর সময় গেল ২ দিন বদলাল এল বর্তমান

নতুন সুরে নতুন যুগে বাজবে আবার গান।

.... শুনতে থাকুন সেই নোয়ার গান।


[নোয়ার মুদ্রায় চাষ করার ইঙ্গিত । বিজ্ঞাপণ এজেন্সির প্রতিনিধি ও তার সহকারির প্রবেশ।]


প্রতিনিধি: স্টপ্‌ স্টপ্‌ স্টপ্‌

সহকারি: কিছু বললেন ম্যাডাম ।

প্রতিনিধি: একবার যদি এই জমিটায় আমাদের হিপ্কোর কীটনাশক কোলাপ্সিডলের বিজ্ঞাপনের হোর্ডিংটা লাগাতে পারি--- চারদিকটা

এমন সবুজ------- এর এফেক্টটা কী হতে পারে ভেবেছ?

সহকারি: পারফেক্ট । আপনার চোখদুটোর প্রসংশা না করে পারছিনা।

প্রতিনিধি: তার মানে?

সহকারি: না, মানে, আই মিন, আপনার চোখে যা এত সহজে ধরা পড়ে তা আমরা কষ্ট করেও দেখতে পাইনা ।

প্রতিনিধি: তা পাবে কেন? সারাক্ষণ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলে অন্য কিছু দেখবে কী করে ?

সহকারি: আপনার চোখদুটো সত্যিই সুন্দর।

প্রতিনিধি: থাক, আর বাটারিং করতে হবে না। কাজ করো।

সহকারি: ইয়েস্‌ ম্যাডাম।

প্রতিনিধি: লেখ, ভিলেজ বিশ্বেরচক, মৌজা ভুবনডাঙা।

সহকারি: ভি-লে-জ বি-শ্বে-র-চ-ক মৌ-জা ভু-ব-ন-ডা-ঙা।

প্রতিনিধি: দেখি, গুড। দিস ইজ দ্য প্রোপোজ্ড সাইট ফর পাবলিসিটি অফ আওয়ার প্রোডাষ্টস্‌। বিশ্বেরচক, ও ভুবনডাঙা। অর্থাত,

বিশ্বভুবন জুড়ে পাবে হিপ্‌কোর কোলাস্সিডল নামের কীটনাশক, যাতে শস্যের পোকা, পোকার বাবা-মা, ছেলেপুলে,

এমনকি পোকা খেয়ে যারা বেচে থাকে তারাও মরে ভূত হয়ে যাবে। লিখেছ?

সহকারি; ইয়েস ম্যাডাম ।

প্রতিনিধি: হিপকো রসায়নিক সার। একবার প্রয়োগ করলে বার বার প্রয়োগ করতে হবে। ফসল নেচে নেচে ফুলে ফেঁপে উঠবে।

সহকারি: কমপ্লিট।

প্রতিনিধি: হিপ্‌কো জিন্‌ প্রযুক্তির বীজ। ফসল দ্বিগুন। মানুষ একবার চাষ করতে শুরু করলে ট্রাডিশানাল বীজ, যাকে বলে সাবেকী

বীজ একদিন হাওয়া হয়ে যাবে ।

সহকারি: হা-ও-য়া হ-য়ে যা-বে।

প্রতিনিধি: ওয়াও, বিশ্বেরচক ও ভুবনডাঙা। হিপকো একদিন বিশ্বভুবন জয় করে ফেলবে। দেখি দেখি, কী নোট নিলে? [সহকারির

থেকে নোট বই নিয়ে পড়ে] পোকা মরে যাবে--- ছেলেপুলেও মরবে -শ মা-বাবা মরে ভূত হকে-----হিপ্কো ফুলে ফেঁপে উঠবে

মানুষ একদিন হাওয়া হয়ে যাবে। সংক্ষেপে, হিপ্‌কো হিপ্‌ হিপ্‌ হুররে। অসাধারন শ্লোগান। তোমার এলেম আছে,

পদোন্নতি তোমার বাঁধা।

সহকারি: সত্যি বলছেন ম্যাডাম ?

প্রতিনিধি: অবকোর্স ।

সহকারি: (আনন্দে) হিপ্‌কো হিপ্‌ হিপ্‌ হুররে, হিপ্‌কো হিপ্‌ হিপ্‌ হুররে, হিপ্‌কো হিপ্‌ হিপ্‌ হুররে।

প্রতিনিধি: কিন্তু, এই বিশ্বভুবনের মালিক যে কে। বেচারা গরীব মানুষ, এই সুযোগে ওর ও দুটো পয়সা হবে। এই, তুমি এই

বিশ্বভুবনের মালিকের খোঁজ করো।

সহকারি: হিপ্‌কো হিপ্‌ হিপ্‌ হুররে।

প্রতিনিধি: (ঝাঁঝালো গলায়) এই জমির মালিকের খোঁজ করো।

সহকারি: ইয়েস্‌ ম্যাডাম । (নোয়াকে দেখতে পেয়ে) এই, এই ভাই, এদিকে শোন তো । (নোয়া কাছে আসে) এই জমির মালিক কেরে?

নোয়া: মা-লি-ক?

সহকারি: আরে হাঁ, কানে কি কম শুনিস? বলছি, এই জমির মালিক কে, তা কি তুই জানিস?.

নোয়াঃ জানি।

সহকারি: কে?

নোয়া: কেন? জমি যে চাষ করে সে।

সহকারি: এই, তুই সোজা কথার সোজা উত্তর দিতে জানিসনা ? দেখছেন ম্যাডাম, মাল বেশ ঘোড়েল আছে। দেবো শালা------

প্রতিনিধি: আহ্‌ বিমল, লেট্‌ মি টক টু হিম। আমাকে কথা বলতে দাও। ঠিক আছে ঠিক আছে, তা জমিটা চাষ করে কে ? তুই ?

(নোয়া সম্মতি জানায়) গুড তোর কপালটা ভাল। (বিমল কে) তোরটাও। শোন, তোর জমি আমরা ব্যবহার করতে চাই ।

সহকারি: শুধু দুটো লোহার খুঁটি পুততে চাই।

প্রতিনিধি: খুঁটির উপর শুধু একটা বোর্ড লাগাতে চাই।

সহকারি: নিচে তুই আগের মত চাষ করতে পারবি।

প্রতিনিধি: বিনিময়ে তুই পয়সা পাবি। মাসে মাসে ।

সহকারি: না খেটেই খেতে পারবি ঘরে বসে।

প্রতিনিধি: তাহলে রাজি ? বিমল চুক্তিপত্র বার করো | লেখো-- আজ ইংরাজি ২০২১ সালের--------.

নোয়াঃ আমি রাজি নয়, আমার জমি দেবনা । আমি রাজি নয়, আমার জমি দেবনা । আমি রাজি নয়, আমার----

প্রতিনিধি: এখন থেকে বিশ্বভুবনে শুধু হিপ্‌কোর হোর্ডিং শোভা পাবে।

নোয়া: আমি রাজি নয়, আমার জমি দেবনা । আমি রাজি নয়, আমার জমি দেবনা । আমি রাজি নয় ----

প্রতিনিধি: ব্যাস ব্যাস ব্যাস, এবার সিগনেচারটা করিয়ে নাও।

সহকারি: এই, এদিকে আয়। এখানে একটা সই কর। আমার পদোন্নতি হবে, তুই পয়সা পাবি ফকটিয়া ৷ এক ঢিলে দুই পাখি। আয়

আয় (নোয়া আসেনা) এখানে লোহার খুঁটি পুতে দেব--- তার উপর বোর্ড লাগানো থাকবে------ আমার পদোন্নতি হবে-----

বোর্ডে লেখা থাকবে------ কী লেখা থাকবে? আয়, এদিকে আয়----তাতে কী লেখা থাকবে জানিস?

নোয়া: জানি, আমি সব শুনেছি ।

প্রতিনিধি: শুনেছিস? জানিস? হোর্ডিং তো লাগানোই হলনা। কী শুনেছিস বল দেখি?

নোয়া: পোকা মরে যাবে।

সহকারি: অ্যাঁ?

নোয়া: ছেলেপুলেও মরবে।

প্রতিনিধি: কী?

নোয়া:ঃ বাবা-মা মরে ভূত হবে।

সহকারি: এ কী সব বলছে ম্যাডাম?

নোয়া: হিপ্‌কো ফুলে-ফেঁপে উঠবে।

প্রতিনিধি: কী সব আজেবাজে বকছিস ?

নোয়া: মানুষ একদিন হাওয়া হয়ে যাবে।

প্রতিনিধি: ওহ স্টপ ইট ননসেন্স্‌৷ (সামলে নিয়ে) আরে বাবা তা নয়, ওতে লেখা থাকবে কীটনাশকের নাম---- তোর ফসল নষ্ট করে

যে পোকা তাকে মারার জন্য । ওতে লেখা থাকবে রসায়নিক সারের নাম---- তোর ফসল যা খেয়ে নেচে নেচে উঠবে ।

ওতে লেখা থাকবে জিন্‌ প্রযুক্তির বীজের নাম--- যে বীজ চাষ করলে ফসলে তোর গোলা ভরে যাবে । হোর্ডিং লাগানোর পর

নিজেই পড়ে নিস।

নোয়া: আমি লেখাপড়া শিখিনি। আমি পড়তে জানিনা।

প্রতিনিধি: তা জানবি কেন? এবার দয়া করে একটু লেখাপড়া শেখো বাপ। (স্বগতোক্তি) শালা, ভারতের চাষযোগ্য জমির ৭৫ শতাংশে

এখনো কীটনাশক পড়েনা। এই মুখু চাষাদের জন্য। ভাবা যায় বিমল ? হিপ্‌কোর মার্কেট এখনো ৭৫% বৃদ্ধি পেতে পারত।

সহকারি: ঠিকই বলেছেন ম্যাডাম।আচ্ছা, সরকার কী করছে ? আমরা তো কম ট্যাক্স দিইনা। মুখ্যুগুলোকে ধরে বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্রে

নিয়ে যেতে পারছেনা? বিজ্ঞাপনের লেখাগুলো একটু পড়তে শেখা আর নিজের নাম সই করতে পারা, ব্যাস । এইটুকুই তো

শেখানো।

প্রতিনিধি: যাকগে, ছাড়। ব্যাপারটা নোট করো। (নোয়া কে) হাঁ, যা বলছিলাম, পড়তে জানিসনা তো বুঝলি কি করে?

নোয়া: আমি সব বুঝি। আমার চোখ দিয়ে দেখি। আমার কান দিয়ে শুনি। আমার নাকে গন্ধ পাই।

প্রতিনিধি: তার মানে?

নোয়া: দেখতে পাই, আকাশে পাখির ডানা কমে আসছে। গন্ধ পাই, বাতাস ভরছে বিষ আর বারুদে। শুনতে পাই, হিপ্‌কো হিপ্‌ হিপ্‌ হুররে।

হিপ্‌কো হিপ্‌ হিপ্‌ হুররে।

সহকারি: মেরে হারামজাদার লাশ ফেলে দেব। তুই এখানে নাম সই--- আই মিন টিপসই দিবি কি না?

নোয়া: না।

সহকারি: টিপ সই দিবিনা?

প্রতিনিধি: বিমল, কন্ট্রোল ইওরসেল্ফ।

সহকারি: ম্যাডাম প্লীজ! শালা হারামজাদার জন্য আমার প্রমোশন..... (নোয়া কে) দুটো পয়সা পেতিস। শালা, ভালো কথা কানে ঢুকবে কেন?

নে, টিপসই দে।

নোয়া: (স্বগতোক্তি) মানুষ একদিন হাওয়া হয়ে যাবে।

সহকারি: তবে রে শালা, আজ তোকেই আমি হাওয়া করে দেব (সজোরে ঘুষি মারে নোয়ার বুকে। নোয়া পড়ে যায়)। (ম্যোডাম কে) আমার

প্রমোশনটা একদম বাঁধা ছিল (ম্যাডামের চোখ নোয়ার দিকে---- ক্রমশঃ ভয়ার্ত হয়ে ওঠে) এই শালা মুখ চাষাদের জন্যে

(ম্যাডামের দৃষ্টি অনুসরন করে কাস্তে হাতে নোয়া কে রুখে উঠতে দেখে বাক্রুদ্ধ হয়ে যায়)।

নোয়াঃ খবরদার। যতক্ষণ আমার দুটো হাত আছে আর হাতে এই কাস্তে আছে---- ততক্ষণ এই বিশ্বেরচক আর ভুূবনডাঙার মালিক আমি।

একে আমি বন্ধক দেবনা। আর একবার এদিকে নজর দিবি তো, এই বিশ্বভুবনের মাটিতে তোদের আমি কবর দেব।

(বিমল হাতজোড় করে কিছু একটা বলতে নোয়ার দিকে আগাতে চায়) খবরদার।

[ফ্রীজ হয়ে যায় ও দৃশ্যান্তর]

[নোয়া জল খায়--- কোদালে মাটি কোপায়---- তবলার দ্রুত লয়ের সাথে কোদালের গতিও বাড়ে। নোয়া কোদাল চালায় ও দৃশ্যত হাঁফিয়ে ওঠে। ““হিপকো হিপ্‌ হিপ্‌ হুররে”-- নোয়া মৃত পাখিটাকে খুঁজে পায়, জল খাওয়ায়, আকাশে উড়িয়ে দেয়, মরা পাখি ধপ্‌ করে মাটিতে পড়ে যায়। নোয়া কুড়িয়ে নিয়ে কাঁদে। “হিপ্‌কো হিপ্‌ হিপ্‌ হুররে”--- নোয়া প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে। হাতে কান্তে নিয়ে অদৃশ্য শক্তির মোকাবিলা করে। যেন ছায়াযুদ্ধ। দুজন সিপাহি নোয়া কে অনুসরণ করে। হঠাত্‌ সামনাসামনি----] নোয়া: খবরদার----- [ফ্রীজ ও দৃশ্যান্তরা

[গানের দল প্রবেশ করে। গান চলতে থাকে। ওই সময়ের মাঝে মঞ্চে বয়ক্ষ শিক্ষাকেন্দ্র তৈরি হতে থাকে। ব্ল্যাকবোর্ডে শুরুতেই লেখা থাকে, “মস্তিষ্কের উর্বরতা বাড়ায় শিক্ষা আর জমির উর্বরতা বাড়ায় হিপকো রসায়নিক সার”।

গানের দল:

উড়ে যা রে পাখি

পালিয়ে যা পাখি

তোর পৃথিবী নিলাম হবে রইবে না আর বাকি।

ঘাস ছিল ফড়িং ছিল শামুক ছিল তোর

সকল কিছু করলো চুরি রসায়নিক চোর

হায় রে রসায়নিক চোর

হায় রে রসায়নিক চোর।


ফসলে সু-গন্ধ ছিল গন্ধ বাতাসেতে

নোয়া একা খুঁজে মরে কাস্তে নিয়ে হাতে

শধু কাস্তে নিয়ে হাতে

শুধু কাস্তে নিয়ে হাতে।

ফল ফসলে বিষ মিশেছে কলের জলেও বিষ

বিষের ভারে ধুঁকছে দেখ পাকা ধানের শিষ

হায় হায় পাকা ধানের শিষ

হায় হায় পাকা ধানের শিষ।


সিস্টেমেতে এখন নোয়া পড়ে গেল ধরা

এখন থেকে শুরু হলো নোয়ার লেখাপড়া

দেখ নোয়ার লেখাপড়া

দেখ নোয়ার লেখাপড়া। (গানের দলের প্রস্থান)


শিক্ষক: আজ তোমাকে এখানে আনা হয়েছে এক মহান উদ্দেশ্যে। (নোয়া “হাঁ” করে থাকে) তোমাকে শিক্ষা দেওয়া হবে।

নোয়া: শিক্ষা কী?

শিক্ষক: (থতমত খেয়ে) শিক্ষা কী? শিক্ষা হল-------শিক্ষা হল------শিক্ষা হল গিয়ে এক মহান ব্যাপার। মানে হল, অশিক্ষা একটা

অভিশাপের মত। এই অভিশাপের হাত থেকে দেশ তথা জাতিকে জ্ঞানের আলো জ্বালাতে শিক্ষার ভীষণ প্রয়োজন।

(নোয়ার মুখে কিছু না বোঝার অভিব্যক্তি) বুঝতে পারলেনা? (নোয়া ভয়ে সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ে) খুব ভালো।

একটা গল্প শোনাই, তাহলে ব্যাপারটা আরো পরিষ্কার হয়ে যাবে।

------ এক ছিল তোতা পাখি। সে রাজার বাগানে ফল খেত আর খুশি মনে উড়ে বেড়াত। রাজা বিরক্ত হয়ে বিধান চাইলেন। কমিশন বসল। কমিশন জানাল, অশিক্ষাই এর প্রধান কারণ। হতচ্ছাড়া অশিক্ষিত পাখি, কোনো বিজ্ঞাপন পড়তে জানেনা। বর্নভিটা, কমপ্ল্যান, হরলিক্স, কোকাকোলা, মিনেরাল ওয়াটার খায় না। খড়কুটো দিয়ে বাসা বানায়, এ, সি, সি অম্বুজা সিমেন্টের নাম শোনেনি। এলেগ্যন্ট রড, এশিয়ান পেইন্টস ওদের বাসা তৈরীতে কোনো কাজেই লাগেনা।

ব্যাস, পাখিটাকে খাঁচায় পোরা হল। তারপর তো এক হৈ-হৈ ব্যাপার। সোনার খাঁচা--লোক-লঙ্কর--- লিপিকর---- তদবির----- তদারক---- সিপাই কোতোয়াল------যাকে বলে এক সাড়া জাগানো ব্যাপার।

পাখিটাকে শিক্ষা দিতে কবি এল কবিতা শোনাতে------ [স্পট-লাইট ঘুরে যায়]

কবি: (ঝোলা থেকে একটা খাতা বার করে)

আমার কবিতা। লক্ষ্মী সোনা।

লক্ষ্মী সোনা

যা খুশি তুই

করগে যা না

টুপি দাড়ি

নামাবলি

গরু জবাই

পাঁঠা বলি।

মানুষ কিনবি?

কিনে নে না।

বিকোবি তুই?

বুকিয়ে যা না।

খাদ্য হবি?

হ।

মানুষ খাবি?

খা।

জ্বালিয়ে দিবি?

দে না।

লক্ষ্মী সোনা

কিচ্ছুতে তোর

নেইকো মানা

আস্থা রাখিস

মন্ত্র-তন্ত্রে

(আর) ফি-বছরে

বোতাম টিপিস

ভোট যন্ত্রে।

সোজা কথা

সময় থাকতে

ভালোয় ভালোয়

পোষ মেনে যা

গণতন্ত্রে।

[স্পট্‌-লাইট্‌ কেটে যায়]

শিক্ষক: পুরোহিত এলো ধর্মকথা শোনাতে।

[স্পট্-লাইট]

পুরোহিত:

শুন শুন ছোটোলোক শুন বি. পি, এল,

শুন শুন চোর ছ্যাঁচড় শুনহ আঁতেল

ধর্ম নামে বর্ম এক এল ধরা মাঝে

চড় খাও লাথি খাও গায়ে নাহি বাজে

ইহলোকে কর্ম করো খেয়ে আধ-পেটা

পরলোকে হয়ে যাবে তুমি বিড়লা-টাটা

জন্ম মৃত্যু বাঁচা মরা জগতের মায়া

সেই সত্য কায়াধারী তুমি তার ছায়া

তাই বলি যতক্ষণ আছে হে নিঃশ্বাস

গণতন্ত্রে মন্ত্রতন্ত্রে রাখহ বিশ্বাস

প্রাণপনে মেনে চলো জগতের প্রথা

“নুন খাও গুন গাও” এই সারকথা।

বিজ্ঞাপন: “সারকথা, স্পন্সর করল, হিপ্‌কো রসায়নিক সার”

নোয়া: পাখিটা? পাখিটার কী হলো?

শিক্ষক: পাখিটার শিক্ষা পুরো হলো।

নোয়া: কেমন করে বুঝলে?

শিক্ষক: পাখি আর আকাশে ওড়ার জন্য খাঁচার মধ্যে ডানা ঝাপটায় না। খিদে পেলে চিত্কার করে না। খুঁচিয়ে দিলে ঠোকরাতে আসে না---

পাখি এখন রাজার মনের মতো। একেবারে সভ্য ভদ্র ও গণতান্ত্রিক (বোর্ডে লিখতে যায়)।

নোয়া: গ-ণ-তা-ন্ত্রি-ক?

শিক্ষক: ওসব তোমার না জানলেও চলবে। (আবার লিখতে যায়)।

নোয়া: তোমাকে কোন রাজা পাঠিয়েছে?

শিক্ষক: ওহ, এত প্রশ্ন করো কেন? আর তাছাড়া, আমি তো তোমায় শিক্ষিত করতে আসিনি। (আবার লিখতে যায়)।

নোয়া: তবে?

শিক্ষক: তোমাকে স্বাক্ষর বানাতে এসেছি। (আবার লিখতে যায়)

নোয়া: স্বাক্ষর কী?

শিক্ষক: এই তো কাজের কথা হল। এই দেখো, এ-এ-এই হল স্বরে “অ”, আর এই হল স্বরে “আ”, এই হল “ই”------ এই হল-------

[দ্রুত লয়ে তবলার সাথে শেখানোর প্রক্রিয়া অঙ্গভঙ্গী-তে বোঝা যায়]

শিক্ষক: (হাতে মুখে চকের গুঁড়ো ও কপালের ঘাম রুমালে মুছে) এখন তুমি সাক্ষর হয়ে গেলে। তোমার নাম এখন সাক্ষরদের তালিকাভুক্ত

হল। ভুবনডাঙা আজ একজন সাক্ষর নাগরিক উপহার পেল। আজ থেকে তোমার চোখ ফুটলো। এখন থেকে তুমি পড়তে পারবে।

নোয়া: সব পড়তে পারব? বড় বড় বোর্ডের লেখাগুলো (উচ্চস্বরে অথচ স্বগতোক্তির মতো)? স-ব?

শিক্ষক: বিজ্ঞাপনের লেখা তো? আরে, ওগুলো তো তোমাকে পারতেই হবে। কোম্পানী হলো সরকারের বন্ধু। আর সেই সরকার আমাকে

মাইনে দেয়। এটুকু তো তোমাকে পারতেই হবে। সেই সাথে নিজের নামটা পড়তে ও লিখতে ভুলোনা কিন্তু। বিপদে আপদে কাজে আসবে।

নোয়া: বি পদে - আ প দে-----?

শিক্ষক: আরে বাবা, ধরো, ঘূর্ণিঝড় বা বন্যা হল----- কিংবা সুনামি বা ভূমিকম্প---- অথবা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা রাজনৈতিক হানাহানি।

তোমার ঘর ভেঙে গেল, ফসল ডুবে গেল অথবা চাল-চুলো পুড়ে ছাই হয়ে গেল-------- (নোয়া উদত্রান্তের মত তাকায়। চোখে-মুখে এ সব কল্পিত দৃশ্য ভাসে যেন। একবার শ্লেটের দিকে আর একবার শিক্ষকের মুখের দিকে তাকায়)।

নোয়া: (ভয়ার্ত ভাবে) তারপর?

শিক্ষক: তারপর ত্রাণ। রাশি রাশি টাকা, চাল-ডাল-ওষুধ-কম্বল----- আর লঙ্গরখানায় দুবেলা পেট পুরে বিনিপয়সার খাওয়া।

নোয়া: সব আমার জন্য?

শিক্ষক: ইয়েস, তোমার জন্য। ঘূর্ণিঝড়--বন্যা--দাঙ্গা--তেরপল--বিজ্ঞাপন--লঙ্গরখানা সব তোমার জন্য। শুধু লঙ্গরখানার নামের দীর্ঘতম

তালিকায় নিজের নামটা পড়ে নিও। তারপর সব তোমার। এস, আর একবার প্র্যাকটিস করিয়ে নিই।

[দ্রুত লয়ে তবলা---- প্র্যাক্টিসের ভঙ্গিমা----- দৃশ্যান্তর]


[নোয়া হতভম্ভের মতো বসে থাকে, যেন পূর্বদৃশ্যের ঘোরের মধ্যে। দৃশ্যপট বদলে এখন বক্তৃতামঞ্চ। দুজন পুলিশ প্রবেশ করে, একজনের হাতে কুকুরের চেন। হঠাত্‌ আবিষ্কার করে চেনের অপর প্রান্তে কুকুর নেই। এ ওর মুখ চাওয়া-চাওই করেই একজন কুকুরের ভুমিকায় অবতীর্ন হয়]

পুলিশ ১: আপনার পার্ট-টাইম জব হিসাবে এখন আপনি হচ্ছেন বম্ব-স্কোয়াডের কুকুর। কাজ হল, শুঁকে বলে দেওয়া এখানে বিস্ফোরক

আছে কি না। বুঝতে পারলেন?

পুলিশ ২: কেঁ-উ (অর্থাত, বুঝেছি)।

পুলিশ ১: এবার আপনার কাজ শুরু করুন। (পুলিশ ২ দাঁড়িয়ে থাকে। বিস্কুট দিলে সে তাড়াতাড়ি পকেটে ঢোকায় ও কুকুরের মতো

চারদিক শোঁকা শুঁকির কাজ শুরু করে)।

পুলিশ ২: গর্ গরর-গর্ গরর----(নোয়ার কাছে গিয়ে)। |

পুলিশ ১: (লাথি মারে পাছায়)।

পুলিশ ২: ক্যাঁ ও------ ক্যাঁ ও ----

পুলিশ ১: আরে, আপনি বুঝতে পারছেননা কেন? এ তো কোনো জঙ্গী নয়, এ হল জনগন।

[গন্ধ শোঁকার শেষ পর্যায়ে সাইরেন ও হুটার বেজে ওঠে। নেতার প্রবেশ। সাথে দুজন ব্ল্যাক ক্যাট সিকিউরিটি। পুলিশ ২ এখন নিজেকে সিঁড়ি বানিয়ে দিয়ে নেতাকে মঞ্চে উঠতে সাহায্য করে৷ নেতা মঞ্চে উঠতেই হাততালির শব্দে ফেটে পড়ে মঞ্চ।]

নেতা: (হাতের ইঙ্গিতে হাততালির শব্দ থামায়) বন্ধুগন, সামনে ভোট, তাই এই জনসভা। আজ এই জনসভায় আপনারা যে দলে দলে

যোগ দিয়েছেন তাতে আমি এবং গণতন্ত্র ধন্য। দূর-দূরান্ত থেকে দলে দলে, কেউ খেয়ে, কেউ আধপেটা খেয়ে আবার কেউ বা না খেয়ে সেই ভোরবেলা থেকে বসে আছেন তার জন্য আপনাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। নেতা এবং গণতন্ত্রের প্রতি আপনাদের এই আনুগত্যে আমি মুঝ্ধ। আপনাদের এই একরোখা স্বভাব, “খাই বা না খাই, ভোট দেবার বাই”, এই বাই, অর্থাত কি না ঝোঁক বা একগুঁয়ে মনোভাব বাঁচিয়ে রেখেছে এই মহান গণতন্ত্রকে। তাই এই মহান গণতন্ত্র --------- (নোয়া সশব্দে আড়মোড়া ভাঙে। বন্তৃতায় ছেদ। নেতা অপ্রস্তুত। জনগন চুপ। কিছুক্ষণ আগে থেকে খৈনী টিপতে থাকা পুলিশ নিজের খেয়ালে খৈনীর চুন ঝাড়তে শুরু করে। সেই শব্দের সাথে জনজগনের হাততালি মিশে যায়। নেতার হাতের ইশারায় হাততালির শব্দ থামে)। মাননীয় আমজনতা, আজকে আমি আপনাদের সামনে যে বক্তব্য রাখতে এসেছি তার কারন আপনারা জানেন, কারন সামনে ভোট। যে কারনে আগেও এসেছি, আগামিতেও আসব। ফলে বেশি আর কথা বাড়াবোনা, ভোট-টা আপনারা সবাই দেবেন----অবশ্যই দেবেন। কোন বোতাম টা টিপবেন? যে কোনো বোতাম। গণতন্ত্রে ভেদাভেদের কোনো জায়গা নেই৷ যেটা খুশি টিপুন। আর সব বোতামের চেহারা এক এবং কাজও এক। ফলে আপনার মুল্যবান সময় ভাবনাচিন্তা করে অপচয় না করে নিশ্চিন্তে যে কোনো বোতাম টিপে দিন৷ আর যে বোতাম-ই টিপুননা কেন, ভোট তো পাবো আমি (ঘুরে ঘুরে নিজের আলখাল্লা দেখায়। আলখাল্লায় বিভিন্ন সংসদীয় রাজনৈতিক দলের প্রতীক আঁকা। নেতা জল খায়।)।

বিজ্ঞাপন: বক্তৃতার এই অংশটুকু নিবেদন করলেন, হিপকোর কীটনাশক কোলাপ্সিডল; খাবে পোকা মরবে পোকা

ফলবে ফসল থোকা থোকা।

নেতা: শেষ করার আগে শুধু আতেলদের উদ্দেশ্যে দুটো কথা বলে রাখি। শোনো হে আঁতেলগন, ভোটযন্ত্রে বোতাম টিপবার পর নিজেদের

মধ্যে আর ডান----বাম বলিয়া বিভাজন করিবেন না৷ কারন, মুলত এবং বস্তুত উহারা একই। উহাদের পন্থা এক; বাজারপন্থী। উহাদের নীতি এক, উদারনীতি। আর আমি উহাদের সম্মিলিত রূপ গণতন্ত্র। তাই এই মহান গণতন্ত্র------- ( নোয়া আনমনে মুড়ি খাচ্ছিল। খাওয়া শেষ। মুড়ির ঠোঙাটা সশব্দে নোয়া ফাটায়)।

[বিস্ফোরনের মতো শব্দ। দুজন পুলিশ পজিশন নেয় যেন যুদ্ধক্ষেত্র। দেহরক্ষী দুজন নেতাকে গার্ড করে বাইরে নিয়ে যায়। প্রচন্ড গোলাগুলির শব্দ। নোয়াকে ধরার চেষ্টা। দৃশ্যান্তর।]


[প্রায়ান্ধকার মঞ্চের একধারে নোয়ার উপর চলে অমানুষিক পুলিশি অত্যাচার।

[সাংবাদিক ও তার ক্যামেরাম্যানের প্রবেশ]

বিজ্ঞাপণ: লাইভ টেলিকাস্টের এই অংশটুকু নিবেদন করছেন, হিপকোর কীটনাশক, কোলাপ্সিডল। পোকা মারার অব্যর্থ ওষুধ।

সাংবাদিক: (ক্যোমেরার সামনে) গত দুবছর আগে এক্য পার্টির নেতা শ্রী দুর্বিনাশ দত্তের বক্তৃতামঞ্চে নাশকাতা ঘটিয়ে যে জঙ্গী পালিয়ে

গিয়েছিল সেই আবাদবাদী নেতা নোয়া গতকাল ভোরে গ্রেফতার হয়েছে। আমাদের বীর সামরিক বাহিনী ও ন্যাটো বাহিনীর যৌথ উদ্যোগে এই সাফল্য এসেছে। এই বিশাল সাফলোর জনা মার্কিন প্রেসিডেন্ট দুই বাহিনীর প্রধান কে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এখন আমরা সরাসরি দেখবো এই আবাদবাদী নেতা নোয়ার ইন্টারোগেশন্‌। (ক্যামেরাম্যান কে) এক্সপ্রেশনগুলো ক্লোজ-আপ-এ নাও। যেন প্রমিনেন্টলি আসে। (অত্যাচার চলতে থাকে। কামেরাম্যান বিভিন্ন পোজ-এ সেগুলো কামেরাবন্দী করে)। এখন আমরা যাব ইন্টারোগেশনের দায়িতে থাকা পুলিশ অফিসারের কাছে। (পুলিশ কে) এই আবাদবাদী জঙ্গী কে গ্রেফতার করার সাফল্যে আপনার এই মুহুর্তে কী অনুভূতি হচ্ছে?

পুলিশ: (নিজের চুলের ভাঁজ, সাজপোষাক ইত্যাদি নিয়ে সচেতন হয়ে পড়ে)। (আহ্লাদি গলায়) ভীষণ ভালো লাগছে। শুনছি এবার নাকি

আমার প্রমোশন হবে।

সাংবাদিক: কোনো স্পেশাল ইনফরমেশন?

পুলিশ: না। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনো তথ্য পাইনি।

সাংবাদিক: ধন্যাবাদ। এবার আমরা যাৰ আবাদবাদী জঙ্গী নোয়ার কাছে। (নোয়া কে)

পুলিশ কাস্টডিতে আপনার কোনো অসুবিধা হচ্ছেনা তো? (নোয়া নিরুত্তর) আমরা কোনো উত্তর পাচ্ছি না।

পুলিশ; ম্যাডাম, প্লীজ, আপনাদের কে এবার আসতে হবে। এখন একটা কন্ফিডেন্সিয়াল এন্ড স্পেশাল ইন্টারোগেশন সেশন্‌ আছে।

সাংবাদিক: আপনারা শুনলেন----(পুলিশ হাত দিয়ে পথ দেখায়) এখন স্পেশাল ইন্টারোগেশন্‌ আছে_------(পুলিশ আলতো করে ঠেলতে

থাকে)----দেখা যাক----- কী হয়------

[বলতে বলতে সহকারী সহ সাংবাদিক ম্যাডামের প্রস্থান]

[গানের দলের প্রবেশ। অমানুষিক অত্যাচার আবার শুরু। নিঃশব্দ আর্তনাদের অবিব্যক্তি নোয়ার মুখে ও চোখে।]


গানের দল:

নোয়া নামে ছিল এক কৃষক

সূর্যের মত ছিল হাসি

কান্তেটা শান দিয়ে

ফসলের গান গেয়ে

স্বপ্নকে বলে ভালবাসি

হো হো হো হো স্বপ্নকে বলে ভালবাসি

হো হো হো হো স্বপ্নকে বড়ো ভালবাসি।


কাদা জলে চাষ করে নোয়া

যুগে যুগে ঝরে তার ঘাম

লাঙলের ফালে ফালে

বাদাবনে ঝড় তোলে

কে আর বোঝে তার দাম

হো হো হো হো কে আর বোঝে তার দাম

হো হো হো হো কে আর বোঝে তার দাম।


বহুজাতিকের চোখ নাচে লোভে

সার বিষ করে উৎপাদন

জল জমি আকাশে

বিষ আর বিষ মেশে

থেমে যায় ভ্রমরের গুঞ্জন।

হায় হায় হায় হায় থেমে যায় ভ্রমরের গুঞ্জন।

হায় হায় হায় হায় থেমে যায় ভ্রমরের গুঞ্জন।



প্রলোভনে ভরা বিজ্ঞাপন

দালালরা দেয় ফুসলানি

ফলন বাড়িয়ে নাও

খুশি মনে গান গাও

সিস্টেমটাকে নাও মানি।

হেই হেই হেই হেই সিস্টেমটাকে নাও মানি।

হেই হেই হেই হেই সিস্টেমটাকে নাও মানি।


প্রতিবাদ করে তার নোয়া

হাতে নিয়ে এ যুগের কাস্তে

বিজলীর চমকে

কাস্তের ঝলকে

নোয়া চায় আরও বেশি বাঁচতে।

হো হো হো হো নোয়া চায় আরও বেশি বাঁচতে।

হো হো হো হো নোয়া চায় আরও বেশি বাঁচতে।


আঘাতে আঘাতে আঘাতে

শেষ হয়ে গেল তার প্রাণ

রক্ত রক্ত শুধু

রক্ত রক্ত ঝরে

থেমে গেল ফসলের গান।

হায় হায় হায় হায় থেমে গেল ফসলের গান।

হায় হায় হায় হায় থেমে গেল ফসলের গান।


[অত্যাচারে নোয়া মরে যায়]


প্রতিবাদ হয়ে গেল স্তব্ধ

কাস্তের চোখ জলে ভাসে

নোয়া তুই ওঠ জেগে

শত্রুরা যাক ভেগে

জনগণ আজ তোর পাশে।

হই হই হই হই জনগণ আজ তোর পাশে।

হই হই হই হই আমরা রয়েছি তোর পাশে।


[আবহে জনপ্লাবনের শব্দ ক্রমে নিকটবর্তী হয়। নোয়ার পুনরুত্থান হয়। গান চলতে থাকে, হই হই হই হই জনগণ আজ তোর পাশে।

হই হই হই হই আমরা রয়েছি তোর পাশে। নাটকের অন্যান্য কুশিলবেরা মঞ্চে প্রবেশ করে ও গানে গলা মেলায়। নোয়ার ঊর্ধ্ব বাহুতে সবাই তাদের মুষ্ঠিবব্ধ হাত মিলিয়ে দেয়]


হই হই হই হই জনগন আজ তোর পাশে

হই হই হই হই আমরা রয়েছি তোর পাশে।

[জনপ্লাবনের শব্দ স্তিমিত হয়ে আসে। আবহে নতুন ভোরের আভাস।]

[ধীরে ধীরে পর্দা নেমে আসে]

Comments


bottom of page