top of page

লাল সিং দিল-এর সাতটি কবিতা

  • Writer: প্রতিরোধের ভাষা
    প্রতিরোধের ভাষা
  • Sep 27, 2021
  • 3 min read

লাল সিংহ্ দিল : এক বিপ্লবজাতকের অপমৃত্যু


ree

নকশালবাড়ির খবর ছড়িয়ে পড়ল দাবানলের মতো। সেই দিনগুলিতে আমি ঠিকা মজুরের কাজ করছিলাম। মাথায় ভারি বোঝ নিয়ে মই বেয়ে উঠতাম আর নামতাম, আর সেই শ্রম আমাকে অদ্ভুত এক উদ্যম দিত। আমি ভাবতাম, যদি ভিয়েতনামে থাকতাম এখন তাহলে যেটুকু অর্জন করেছি তা ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারতাম। ভাবতে পারছিলাম, আমি রয়েছি আসন্ন বিপ্লবের দোরগোড়ায়।

[ 'দাস্তাঁ' ]





নকশালবাড়ি পরবর্তী কম্যুনিস্ট বিপ্লবী আন্দোলনের অভিঘাত স্থায়ীভাবে বদলে দিয়েছিল পঞ্জাবি কবিতার ভুবনকে - বদলে গিয়েছিল কবিতার বিষয় আর ভাষা, বাগধারা আর স্বর। এই বদলে যাওয়া পঞ্জাবি কাব্যচর্চার শ্রেষ্ঠ ফসলেরা ছিলেন অবতার সিংহ্ সন্ধু (পাশ), হরভজন হালওয়ারভি, দর্শন খটকর, অমরজিৎ চন্দন, সন্ত রাম উদাসী... আর অবশ্যই, লাল সিংহ্ দিল।

১৯৪৩-এ পঞ্জাবের ছোট্ট শহর সমরালার উপান্তে ঘাংগরেলি সিখানের এক রামদাসিয়া চামার পরিবারে জন্ম লাল সিংহের। এই 'নিচুজাতের' অন্যদের মতোই এই পরিবারটিরও না ছিল অর্থ বা একটুকরো জমি, না স্কুলের শিক্ষা - এককথায় কিচ্ছু না যা একজনকে সাহিত্যে উৎসাহিত করতে পারে। সারাজীবন তাঁর বাবা শ্রম দিয়ে গেছেন পরের জমিতে। লাল সিংহ্ তাঁর সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রথম যিনি ক্লাস টেনের বেড়া পেরিয়েছিলেন। ঠিকা শ্রমিকের কাজ করতে করতেই কলেজে ভর্তি হন তিনি, অনেক কলেজ বদলেও পড়া শেষ করতে পারেননি তিনি। কবিতা লেখা বন্ধ করেননি, স্কুলজীবন থেকেই তাঁর শুরু। শৈশব থেকে সয়ে আসা বর্ণবৈষম্যের অপমান ভিতরে ভিতরে তাঁর পরীক্ষা নিত প্রতিদিন, আত্মজীবনী 'দাস্তাঁ' তিনি শুরুই করছেন এভাবে : "আমার জীবনে বারবার আমাকে অগ্নিপরীক্ষার মধ্যে পড়তে হয়েছে, আমি যে না পুড়ে গিয়ে বের হয়ে আসতে পেরেছি, সেটাই প্রায় অলৌকিক"।

তারপর ১৯৬৮। বিপ্লবী সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়া। আর, এক কবির নবজন্ম। ১৯৬৯-এ জেলে যান, অসহ্য শারীরিক নির্যাতন সহ্য করেন।‌

'৭১-এ জেল থেকে বেরিয়ে খুঁজে পাননি কমরেডদের, পেয়েছিলেন পরিবারের প্রত্যাখ্যান। সঙ্গে পুলিশের নজরদারি। সব এড়াতে প্রায় পালিয়েই গিয়েছিলেন উত্তরপ্রদেশে। রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এই সময় থেকেই তাঁর দিশাহীন জীবনের শুরু। কী না করেছেন জীবনধারণের জন্য। যার শেষ, পঞ্জাবে ফিরে আসা আর মদ্যপ জীবনে। মৃত্যুর আগের শেষ ক'টি বছর সমরালার কাছেই এক বাস গুমটিতে চায়ের দোকান চালিয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তি করেছেন। ২০০৭-এ লুধিয়ানার এক হাসপাতালে যখন মৃত্যু হয় তাঁর, তখন তিনি এক প্রায় অপ্রকৃতিস্থ মনের, ভেঙে পড়া শরীরের, ক্ষয়ে যাওয়া মানুষ। এই ক্ষয় কোথাও কি আমাদের মনে পড়িয়ে দেয় জীবনানন্দ দাশকে?

ফারাক একটাই। জীবনানন্দের শেষ জীবনের কবিতা জুড়ে ছিল মৃত্যুচেতনার রক্তক্ষরণ। আর লাল সিংহ্ দিলের কবিতায় জীবনের উদযাপন। বিপ্লবী রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাওয়া স্থিত থাকতে দেয়নি লাল সিংহকে। শুধু আশ্চর্যভাবে স্থিত থেকে গেছে তাঁর কবিতাগুলি। অনাগত বিপ্লবের পক্ষে।

তিনটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল লাল সিংহ্ দিলের। 'সেতলাজ দি হাওয়া' (শতদ্রুর বাতাস/ ১৯৭১), 'বহোত সারে সূরজ'‌ (অনেকগুলি সূর্য/১৯৮২) এবং 'সথ্থার' (শস্যের গোছা/১৯৯৭)। আর তাঁর আত্মজীবনী - 'দাস্তাঁ' (কাহিনী/১৯৯৮)।



জাত

আমায় ভালবাসার

ও অন্য জাতের মেয়ে

আমাদের আপন মৃতদের ও

এক জায়গায় জ্বালান হয় না৷



তার বাবার জমিতে

বাবা, কখনও কখনও আমি

তোমার জমিতে

হালকা হাওয়ার মত নাচি

আমি ভুলে যাই

এই জমিগুলি আর আমাদের নেই

আমাদের যা কিছু ছিল

তার সঙ্গে এগুলিও আমরা হারিয়েছি৷

বাবা, তোমার জমিগুলিতে

জঙ্গলী ঘাস জন্মাচ্ছে

একদিন তোমার জমিতে

ট্রাক্টর নাচবে৷



দেশ

আমার দেশের আর একটি চেহারা আছে

একটি আমার জাতি আরও আছে

যেখানে সেখানে কোন একটি পাড়া

যেখানে বসবাসকারী খেটে খাওয়া মানুষ

আধপেটা খেয়ে

আধ শোওয়া হয়ে

ব্যাথিত অঙ্গগুলিকে আরাম দেওয়ারজন্য

তারাগুলন রাত কাটায়৷

আমার দেশ তেকে দূরে

যেখানে কোথাও রয়েছে আমার সেই দেশ

যেথা থাকে আমার সেই লোকজন

আমার এই দেশের জন্য গান গাইতে সেতারের তার ছুঁই

সাগরের পার তেকে চলে আসে সেই সব ধ্বনি

কে আছে যে তাকে স্বাগত জানাবে?

কে আছে যে এই সীমান্তের সঙ্গের নদীর জলে

প্রতিবছর রক্ত বহাবে?

আমার দেশের আর একটি চেহারা আছে

আমার একটি জাতি কারও আছে৷



শব্দ

শব্দ তো বলা হয়ে গেছে

আমাদের বহু আগেই

এবং তার বহু পরেও

আমাদের প্রত্যেকটি জিভ

পারলে কেটে নিও

কিন্তু শব্দ তো বলা হয়ে গেছে৷



কাচের বন্দি

কারোর দয়ায়

কিছুই চাই না আমাদের

কোন স্বর্গ

কোন ধর্ম রাজের রাজত্ব

বা কোন ‘সমাজতন্ত্র’

আপনি বলুন তো

আমাদের কিছু করার জন্য

আপনি হন কে?

আমাদের রক্ত বওয়ায়

আপনার খুব ‘চিন্তা’ হয়

আর এই রক্ত সামলানোর জন্য

যে বিকল্পগুলির উল্লেখ কর

ঝাঁকার সঙ্গে সেগুলিকে

লোকেরা ভেঙে ফেলবে

কাঁচের চাকচিক্য আমাদের মঞ্জুর নয়

কোন রঙের উজল্যের স্বপ্ন

কোথাও নেই

কারো দয়ায়

কিছুই আমাদের মঞ্জুর নয়৷



যখন জঙ্গল জ্বলে

যখন জঙ্গল জ্বলে যায়

আবার ফুটে ওঠা কচি কলিগুলি

ধারাল শুকনো ঘাস হলুদ মাটি

সব কিছু সুগন্ধিত থাকে এখানে

কিন্তু প্রত্যেকটি অগ্নি কাণ্ডের পর

দুর্গন্ধে ভরে ওঠে

যার নীচে মাটি অসহায়

কচি কচি গলিগুলি সেই গন্ধেই

ফোটে আর বাড়ে

জঙ্গলের সবটাই উঠে দাঁড়ায়

আমরা গোলাম থেকে যাই৷



জেলের দেওয়াল

জেলের দেওয়াল থেকে

পলেস্তারা খসতেই

তার নীচে থেকে বেরিয়ে পনল

হাতুড়ি কাস্তের চিহ্ন

আমিও একটি নতুন ছবি

এঁকে এসেছি

নাট বল্টু কষার ছবি

শরণ আমরা খুব ঢিলেঢালা

আর অন্ধকার রকেটের গতিতে চলে৷


অনুবাদ কাঞ্চন কুমার

Comments


bottom of page