এই কবিতার কোনও নাম নেই
- সুফল সান্যাল

- Sep 21, 2021
- 2 min read
Updated: Sep 30, 2021
নিহত কবির জন্য একটি কবিতা
প্যান্ডেমিক। প্ল্যান্ডেমিক? লেট আস গো ইন্টু লকডাউন ফর লাইফ। এক আঁকিয়ে পাহাড়ের ডিজিটাল ছবি এঁকে অন্তর্জালে, সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করছেন- এইদিনগুলিতে ফিরতে চাইলে আরও কয়েকমাস ঘরে থাকুন। অথচ প্রাগৈতিহাসিক ধূলো উড়ছে শিল্পাঞ্চলে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক কারখানা। জেগে উঠছে এক হাংরি প্রজন্ম। ক্ষুধার্ত ভারত; রাষ্ট্র এবং বেনিয়াতন্ত্রের নির্লজ্জ শোষণ ও গণহত্যার দলিল। সুসজ্জিত ঘরে প্লাস্টিকের ফুল। সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং সত্ত্বেও মার্বেলের চকচকে মেঝেতে ক্ষুধার্তদের রক্তবমি। সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে নামছে। রাত্রি গভীর হলে আমরা একথালা ভাতের জন্য কামড়াকামড়ি করছি। একটুকরো মাংসের জন্য। লেসার ইভিল তত্ত্ব নামিয়ে, লিবারেলরা বোঝাচ্ছে অনাহারে থাকাও একটি চয়েস। অতএব স্টে হোম স্টে সেফ। চোয়ালের পিছনে ফুলতে থাকা মাংসপিণ্ড; চিৎকার। চিৎকৃত উচ্চারণ। এখনই সময় সার্জারির। নয়তো দেরি হয়ে যাচ্ছে। বাকি প্রত্যঙ্গকেও খুব দ্রুত গ্রাস করে ফেলবে। টিউমারের বিস্ফারণে চোয়াল ফেটে অজস্র শব্দ ধ্বনি কান্না চিৎকার। লাল টুকটুক ভোর, রক্তেরাঙা অক্ষরের ছিটে দেওয়ালে। স্লোগানে-স্লোগানে। ত্রাণের বিকল্প খুঁজে নিতে আমরা নেমেছি রাস্তায়। আর পিছিয়ে যাওয়া নয়...পুরোটাই ড্রিম সিকোয়েন্স। মাথা ইনফ্ল্যামেশনে দপদপ করতে করতে, পেইনকিলারের সার্জিক্যাল স্ট্রাইকে বালিশে এলিয়ে পড়েছি এইমাত্র। স্বপ্নগুলো ফিরে ফিরে আসছে... এই সমস্ত দৃশ্য, জরাজীর্ণ কংকাল, নাগরিক অবসাদ। জিভ থেকে খসে যাওয়া একেকটা উপনিবেশ। কলম্বাস যেমন বলেছিলেন, "সন অফ আ বিচ্! আমি ভারত আবিষ্কার করেছি।"... মহান রাষ্ট্রের সামনে হাঁটু গেড়ে হাঁপাচ্ছে জনগণ। লালা গড়িয়ে নামছে। কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে। যাতে বেশ নমকিন পরিবেশন করা যায়। আমরা জানিনা কখন ছিনিয়ে নিতে হয়।চেয়ে চেয়ে দেখি, কীভাবে এক বৃদ্ধ, অসুস্থ মানবাধিকার কর্মী, যার লড়াই ছিল আদিবাসী ও রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির দাবীতে, দিনের পর দিন জামিন পায় না। পার্কিনসনের রোগী জলের জন্য স্ট্র এবং সিপার পায় না। ধুঁকে ধুঁকে মারা যায় কারাগারে। ইউএপিএ-- সেডিশন। কালা কানুন। আমাদের উচ্চারণ কেড়ে নিতে চায়। ননসেন্সীয় একরৈখিক ধ্বংসমগ্ন যাপন। অবিরত রক্তস্নাত বিকেল পেরিয়ে আমাদের ওঠানামা ও ভিকটিমসুলভ কিছু স্বর। লকডাউনের শেষে কন্ডাক্টরের গলা, ভেসে আসা ঈশ্বরবাণী, টিকিট ধরুন মাস্টার! ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অথবা বলতে পারি বিপ্রকীর্ণ উড়তে থাকা মথ... অথবা সুরক্ষার গহ্বর। ফ্ল্যাটে ঢুকেই কাপড়চোপড় পালটে ফেলা তৎক্ষনাৎ। বদলে ফেলা মুখোশ। ছোবল-বিষক্রিয়া, কুসংস্কারজনিত তাবিজ-কবচ অথবা ভেলায় ভাসমান লখিন্দর... আমাদের সে ভাঁটফুলও নেই, বেহুলাও নেই। আছে স্টাফ স্পেশাল ট্রেনে বলপূর্বক পেনিট্রেশনের স্ট্রাগলটুকু। টানা রিকশা অথবা স্কন্ধকাটা মুরগির জীবনচক্রের দূরুহতা। এবং আছে, স্টপেজ আসামাত্রই হনহনিয়ে নেমে যাওয়া... পুরো ব্যাপারটাই ভীষণ হিজিবিজি। উদভ্রান্ত এই সময়ের দমবন্ধকর নৈশস্তব্ধতা। ক্ষুধার্তদের বেঁচে থাকাটাই এখন পুরোমাত্রায় স্যুররিয়ালিস্ট। একটি প্রজন্ম ঢুকে যাচ্ছে নিহিলিজমে। কোনো স্বপ্ন না, দর্শন না। সেইসময় ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে একটি উচ্চারণ।
দুর্দশার হেতু চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে, গণহত্যাকারীদের চিহ্নিত করতে। সত্তরের ইতিহাস আমাদের দেখিয়েছে, একটি উচ্চারণ কিভাবে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। রাষ্ট্রের মেরুদণ্ডে কাঁপন ধরিয়ে দিতে পারে। একটি কলমকে আটকাতে, অকথ্য অত্যাচার অথবা পাঁজরে-মাথায় তীব্র বুলেট ধেয়ে আসতে পারে। তবুও, চূড়ান্ত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সামনে একটি সরোজের পাপড়ি যেন বিস্ফোরণজাত সরোবরের ঘূর্ণি। পাহাড় টলিয়ে দেবার স্পর্ধা। সেই স্পর্ধা হয়ে উঠুক আমাদের প্রতিরোধের উচ্চারণ।



Comments