একটি হত্যা ও একটি কবিতার জন্ম
- সব্যসাচী দেব

- Sep 23, 2021
- 2 min read
নিহত কবির জন্য একটি কবিতা
সে ছিল এক স্বপ্নের দিন, সে ছিল এক যন্ত্রণার দিন।আজ এতদিন পরে, নানা হিসেব কষে, সফলতা আর ব্যর্থতার খতিয়ান নিয়ে ইতিহাস লেখা গেলেও সেই স্বপ্ন ও যন্ত্রণাকে ছোঁয়া যাবে না পুরো।আমি রাজনৈতিক কর্মী ছিলাম না, এখনও নই। কবিতা লেখা শুরু করার দু বছর বাদেই খাদ্য আন্দোলন, তা আমাকেও নাড়িয়ে দিয়েছিল। রাজনৈতিক ভাবে সক্রিয় না হলেও বামপন্থার প্রতি আকৈশোর ঝোঁক ছিল, পারিবারিক সূত্রে মার্ক্সবাদের সঙ্গে পরিচয়ও ঘটছিল; যদিও সে-পরিচয়ে আবেগের জায়গাই ছিল বেশি।সেই আবেগ পরে যুক্তিসিদ্ধ হতে শুরু করে ছাত্র-রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কের সূত্রে, যদিও সে-সম্পর্ক খুব দৃঢ় ছিল না।অথচ কবিতা লিখতে শুরু করার পর থেকেই এটা বুঝেছিলাম রাজনীতির ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে কবিতা বা কোনো শিল্পই সৃষ্টি করা যায় না। আমি তা চাইনিও। কিন্তু কীভাবে লিখব!
সে ছিল এক স্বপ্নের দিন। সাতষট্টিতে নক্সালবাড়ি। আমূল নাড়িয়ে দেওয়া এক ঝড়। নাকি চেতনায় আছড়ে-পড়া টর্নেডো! মধ্যশ্রেণির স্বভাবগত পিছুটানে রাজনৈতিক কর্মী হওয়া দুরাশাই রয়ে গেল, ভাবলাম শিল্পসংস্কৃতিই আমার জায়গা। তখন সরোজ দত্তর সঙ্গে নতুন করে পরিচয় শুরু। আগেই কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথে পেয়েছিলাম ‘শিল্পীর নবজন্ম’; আর এক কম্যুনিস্ট মামা আটচল্লিশের আত্মগোপন পর্বে আশ্রয় নিয়েছিলেন আমাদের বাড়ি, সে আমার মনে থাকার কথা নয়। তিনি রেখে গিয়েছিলেন ‘অগ্রণী’ ও আরও কিছু পত্রিকা। একটু বড়ো হতেই সেগুলো এল আমার অধিকারে। সেই সব পত্রিকায় কবেই পড়েছিলাম সরোজ দত্তর কবিতা বা গদ্য লেখা। তারপর আবার নতুন করে জানলাম তাঁকে। সেই জানায় অস্বস্তিও মিশে ছিল। কত কবিতা আর প্যাট্রিস লুমুম্বার অনুবাদে যে সরোজ দত্ত আর ‘দেশব্রতী’-র শশাঙ্ককে একেক সময় মেলাতে কষ্ট হতো। অথচ এও বুঝতাম স্থিরপ্রাজ্ঞ এই মানুষটি বিপ্লবী রাজনীতিতে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁর তীক্ষ্ণ মনন বিপ্লবের প্রশ্নেই শুধু আবেগোদ্বেল হয়ে ওঠে; সেই আবেগ কখনও বর্তমানের তাগিদে অতীতকে অস্বীকার করতে চায়। সব মিলিয়ে এক অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ তাঁর। সেই সরোজ দত্ত ধরা পড়লেন, খবরটাই অবশ করে দিয়েছিল।তারপর সেই ভয়ংকর ভোর।

এরপর কী করব! একজন বিপ্লবীকে লুকিয়ে খুন করবে রাষ্ট্র? আরও কতজনকেও? প্রতিবাদ হবে না? কেমন যেন অসহায় লাগছিল নিজেকে। কবিতাই একমাত্র অবলম্বন, কিন্তু কী লিখব! অথচ লিখতেই হবে আমাকে, লেখা ছাড়া আর কিছু তো জানি না; আর কীভাবে মনে করব তাঁকে! কদিন পরেই ছিল তথাকথিত স্বাধীনতার প্রাক্-রজতজয়ন্তী, কী ভিড় সেই উৎসবে? কত গায়ক কত কবি কত শিল্পী! মনে পড়ল আরেক কবি, কবিতায় এসেছিলেন ‘কমরেড, আজ নবযুগ আনবে না’ আহ্বান নিয়ে, তিনি কেমন মজে গেলেন নেহরুর লাল গোলাপের মোহে! সুভাষ তো চিনতেন সরোজ দত্তকে!
সে ছিল এক যন্ত্রণার দিন, না-পারার যন্ত্রণা। দুমাস পরে লিখতে পারলাম কিছু– এই কবিতাটি। খুব উদ্দীপক নয়, আমি চেয়েছিলাম আমার যন্ত্রণার কথা বলতে আর নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন-দেখা মানুষটিকে চিনতে। পেরেছি কি!



Comments