ইশতেহার
- রেভল্যুশনারি রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন

- Aug 1, 2021
- 3 min read
Updated: Sep 30, 2021
সমস্ত নিপীড়িত সত্তা এবং প্রগতিশীল ও বিপ্লবী শক্তিগুলিকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
রেভল্যুশনারি রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর আহ্বান
বিগত কিছু বছর যাবৎ আমরা ভারতবর্ষের ফ্যাসিবাদী চরিত্রের পরিচয় পাচ্ছি। ইতিহাসে লিখিত ফ্যাসিবাদের সঙ্গে যেমন এর মিল আছে, তেমনই অমিলও আছে। এখন আমরা মোটামুটি এই ঐক্যমত্যে পৌঁছেছি যে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্ব এ’দেশে ফ্যাসিবাদের রূপ নিয়েছে। বর্তমান অবস্থায় পৌঁছনোর জন্য হিন্দুত্ববাদী শক্তি গত প্রায় এক শতাব্দী ধরে প্রস্তুতি নিয়েছে। এর ফলে উপনিবেশ-পরবর্তী ভারতবর্ষের রাজনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি ও ভারতবর্ষে চলতে থাকা উপনিবেশ-পরবর্তী সংকট - এই দুই উতসের/ধারার উপর নির্ভর করে, সংসদীয় রাজনীতির হাত ধরে ফ্যাসিবাদ ক্রমশ শক্তিশালী হয়েছে।
এই সংকটক্ষণে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল : ফ্যাসিবাদের শক্তির যোগান কী? এর উত্তর নিহিত আছে ভারতবর্ষের দমনমূলক সামাজিক কাঠামোয়, যুগ যুগ ধরে যা পুনরুতপাদিত হয়ে আসছে/ যা যুগ যুগ ধরে লালিত হয়ে আসছে। আর্থিক সংকটের সময় তীব্র দমন-পীড়নকে হাতিয়ার হিসাবে অবলম্বন করা শাসক শ্রেণির কাছে নতুন কিছু নয়। যদিও ফ্যাসিবাদ জাতি বা ধর্মকে ধোঁকার টাটি হিসেবে ব্যবহার করে ‘গণতন্ত্র’-কে একনায়কতন্ত্রে রূপান্তরিত করে।
ভারতবর্ষের প্রাচীন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে আঁকড়ে ধরে ফ্যাসিবাদ এগিয়ে আসছে। ফলে, হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদ যে নিছক আর্থিক সংকট থেকে উত্থিত একটি ব্যাপার নয়, তা আমাদের বুঝতে হবে। এবং একই সঙ্গে এটা ভাবলেও চলবে না, যে সংঘ পরিবারের গত এক শতাব্দী ধরে ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টার ফলে অথবা বিজেপি-র নির্বাচনী জয়ের ফলে এ’দেশে ফ্যাসিবাদ আবির্ভূত হয়েছে।
এ’দেশের মৌলিক দ্বন্দ্বগুলি অমীমাংসিত থাকায় অর্থনৈতিক সংকট অব্যাহত রয়েছে। এর তাৎক্ষনিক প্রভাব সমাজের ওপর পড়ছে। কিন্তু এই দ্বন্দ্বগুলির সঙ্গে সম্পর্কিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। তা হলো, শাসক শ্রেণির কাছে ভারতীয় সমাজের নিজস্ব একটি ছাঁচ / মডেল রয়েছে, এই সমাজকে যে ছাঁচে ঢালাইয়ের প্রক্রিয়ায় তা অবধারিতভাবে ফ্যাসিবাদের রূপ নিয়েছে। বিগত একশ বছরের বেশি সময় ধরে আরএসএস-এর যে প্রচেষ্টা, তা এরই অংশ। ঠিক তেমনই ক্ষমতায় থাকা এবং ক্ষমতায় আসতে চাওয়া রাজনৈতিক দলগুলির নেওয়া যাবতীয় নীতিগুলি শাসক শ্রেণির সেই ছাঁচ রূপায়নের নকশারই অংশ। আমাদের দেশের ফ্যাসিবাদের এটি একটি বিশেষত্ব। আগামীকাল বিজেপি ক্ষমতাচ্যুত হলেও এর পরিবর্তন হবে না। অর্থনৈতিক সংকটের দিকগুলি প্রশমিত হলেও শাসকরা তাদের এই ফ্যাসিবাদী নীতিগুলিকে প্রত্যাহার করবে না।
ভারতবর্ষে ফ্যাসিবাদ তৈরি হয়েছে ভারতীয় সভ্যতার কাঠামো, তার আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা এবং সেই সম্পর্কিত আদর্শের উপর ভিত্তি করে। সমাজে বিদ্যমান সকল প্রকার ভেদাভেদ, আধিপত্য, বৈষম্য ও হিংসাকে এটি ব্যবহার করে, পবিত্রতার প্রতিমূর্তি হিসেবে এগুলিকে মহিমান্বিত করে, এগুলিতে অমরত্ব আরোপ করে। সমস্ত আধিপত্যকামী দমনকারী শক্তির বিরুদ্ধে বিভিন্ন লড়াইয়ের ইতিহাসের ধারায় উদিত প্রগতিশীল মূল্যবোধগুলিকে এটি ধ্বংস করে। এটি আধুনিকতার সব ধারাকে নির্মূল করে। আর এই উদ্দেশ্যগুলি নিয়েই এ ভারতীয় ইতিহাসের পুনর্লিখনের চেষ্টা করে।
এই সমস্ত কারণেই ফ্যাসিবাদ এই সমাজ থেকেই শক্তির যোগান পায়। হ্যাঁ, এটা এই ফ্যাসিবাদের অদ্ভুত এক বৈশিষ্ট্য। এটি সম্ভব হয়, কারণ, আধুনিক সমাজের এক অংশের মানসিকতা প্রাচীন সামাজিক কাঠামোর মূল্যবোধগুলির প্রতি অনুরক্ত। ধর্মীয় মৌলবাদ জাতীয় কিছু বাহ্যিক শর্ত এই অনুরাগকে আরও উদ্দীপিত, আরও শক্তিশালী করে। চারপাশে প্রতিনিয়ত চলতে থাকা ধর্মীয় শক্তিগুলির কার্যকলাপ এই অংশের মানুষকে প্রাচীন আদর্শের মধ্যে আশ্রয় খুঁজে নিতে প্রভাবিত করে। এখান থেকেই ফ্যাসিবাদ তার শক্তি সঞ্চয় করে। নিরবতার অনুমোদনে জনগণের সমর্থন ফ্যাসিবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। ফ্যাসিবাদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, এটি প্রগতিশীল আন্দোলনের বিরোধী শিবিরের পুরোভাগে শ্রমিক শ্রেণিকে স্থাপন করে।
কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই যে ভারতবর্ষে ফ্যাসিবাদের একটি দৃঢ় শ্রেণি ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের বিস্তার এখানে এতটাই শক্তিশালী যে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদকেই সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ বলা চলে। এটি হয়ত হাজারে হাজারে নরসংহার করে না, বা জার্মানির মতো কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পোরে না। সত্তর বছরের সংসদীয় গণতন্ত্র হয়ত তা অনুমোদন করে না। তাই একে একার্থে মৃদু তীব্রতার ফ্যাসিবাদ বলা যায়, যা দীর্ঘকাল ব্যাপী কার্যকর থেকে ধীরে ধীরে প্রগতিশীল শক্তিগুলিকে নির্মূল করে। এটি সমস্ত প্রকারের বিকল্পকে নির্মূল করতে চেষ্টা করে। পরিশেষে এটি জনগণকে সামন্ততান্ত্রিক বর্বরতা, পুঁজিবাদী শোষণ, জাতিবাদ, পিতৃতন্ত্র এবং হিন্দুত্বের মতো সব ধরনের অমানবিক পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে অভ্যস্ত করে তোলে।
হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদের সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে চূর্ণ করতে নিপীড়িত সত্তার আন্দোলন এবং প্রগতিশীল ও বিপ্লবী শক্তির জন্য কৌশলগতভাবে কাজ করার এখন হলো সঠিক সময়। সেই দিশায় ইতিমধ্যেই কিছু কাজ এগিয়েছে। তবে তাকে আরও এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
ভারতবর্ষের ফ্যাসিবাদ, যা আমাদের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও সামাজিক ব্যবস্থার ওপর স্থাপিত, সম্পর্কে আমাদের গভীর অন্তর্দৃষ্টি/ উপলব্ধি থাকা প্রয়োজন। এর সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রবণতাগুলিকে তীব্র সমালোচনা করা উচিত। হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা নিপীড়িত সম্প্রদায়ের ও শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামকে আমাদের ব্যাপকভাবে চিহ্নিত করতে হবে। ব্রাহ্মণ্যবাদের বিকল্প হিসাবে ইতিহাসে যে মতাদর্শগুলির আবির্ভাব ঘটেছে তাদের বিশ্লেষণ করা উচিত। এগুলির সবই দর্শন, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মাঝে অন্তর্নিহিত রয়েছে। কিছু ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতার কারণে সেদিনের এই ব্রাহ্মন্যবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারী বিকল্প ধারাগুলি হয়ত ধর্মীয় রূপ নিয়েছিল। কিন্তু এগুলির বস্তুবাদী আকরটিকে স্বীকৃতি দিতে হবে। তার জন্য তেলুগু সমাজের সমস্ত দেশজ ধারাগুলিকে অধ্যয়ন করতে হবে। আর তা হতে হবে শ্রমজীবী মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের উপর ভিত্তি করে।
ভারতীয় ফ্যাসিবাদ যে সভ্যতা ও সংস্কৃতির ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে, তাকেই এর বিরুদ্ধে অস্ত্রে রূপান্তরিত করতে হবে। আর তাকে বাস্তবায়িত করার জন্য দেশজ বস্তুবাদী ও যুক্তিবাদী ধারাগুলির আধুনিকীকরণ করা ও তাদের শক্তিবৃদ্ধি করা প্রয়োজন। ব্রাহ্মন্যবাদী হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদকে মোকাবিলা করার এক সর্বাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি একমাত্র অনুশীলনের মধ্য দিয়েই অর্জন করা সম্ভব। তার জন্য সমস্ত নিপীড়িত সত্তা এবং প্রগতিশীল ও বিপ্লবী শক্তিগুলিকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।


Comments